শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বাস্তবায়নে “উপেক্ষিত শিক্ষানীতি”

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮, ১০:৪২ অপরাহ্ন

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।

যে কোন জাতির শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বিগত আট বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অপরিহার্য ছিল একটি, শিক্ষা আইনের, তা-ও করতে পারেনি সরকার। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিগত আট বছরে কোনো বাজেটেই অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখেনি। বরঞ্চ বিগত তিন অর্থ বছরের শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছিল সরকার। শিক্ষানীতিতে সকল স্তরের শিক্ষকদের সতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কার্যত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি কে পাশকাটিয়ে জোড়াতালি দিয়ে ও নির্বাহী আদেশেই পরিচালনা চলছে। আমলাদের প্রভুত্ববাদী মনোভাব, আকাশ ছোঁয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অনেকাংশেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

এক।
বিগত ৮ বছর ধরে শিক্ষা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াই চলছে। এটা এখন নিশ্চিত যে, এই সরকারের মেয়াদে শিক্ষা আইন তৈরির সম্ভবনা নেই। শিক্ষা আইনটি না হওয়ার পেছনে প্রাইভেট কোচিং ও নোট গাইড ব্যবসায়ীদের তদবিরের কারণে হয়নি এমন উক্তি শিক্ষাবিদগনের । দেশ স্বাধীনতা পরবর্তী আটটি শিক্ষা কমিশন ও কমিটি গঠন হলেও জাতীয় শিক্ষানীতি’১০ ব‍্যতিত অন্যান্য গুলো হয় সরকার পরিবর্তনের কারণে, অথবা বিরোধিতার মুখে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে এই শিক্ষানীতিটি বাস্তবায়নে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল বর্তমান সরকার। অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, মন্ত্রণালয় গুলোর মধ্যে সমঝোতা সমন্বয়হীনতার অভাব, নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ব‍্যর্থ সরকার। অথচ প্রনয়নকৃত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আরও অধিক যত্নশীল ও আন্তরিক হলে, শিক্ষাক্ষেত্র অনন‍্য অবদানের জন্য এই সরকার প্রশংসিত হতে পারতো।

দুই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছায় জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০০৯ সালে ৮ই এপ্রিল শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিশন গঠন করা হয়। ১৮ সদস্যের সুপারিশে শিক্ষনীতি’২০১০ মে মাসে মন্ত্রিসভায় এবং ১৯শে ডিসেম্বর মহান সংসদে অনুমোদিত হয়। ২০১১’র জানুয়ারিতে জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে ২৬টি সাবকমিটি গঠন করলেও বেশিরভাগ কমিটি কোন কাজই করেনি। কেন সাব-কমিটিগুলো কাজ করেননি, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন কৈফিয়ত তলব বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

তিন।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা শুধুই শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে বাস্তবায়নে নেই। এই শিক্ষানীতির আলোকে চলতি ২০১৮ সালের মধ্যেই দেশের সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিশ্চিত করার অংগীকার করা হয়েছে। আমলাদের সদিচ্ছার অভাবে আলোর মুখ দেখেনি এই গুরুত্বপূর্ণ অংগীকারের। ২০১৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ঘোষণা দেয়, প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার। কিন্তু বাস্তবে ঘোষণা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

চার
শিক্ষানীতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে দুটি আলাদা অধিদপ্তর যথাক্রমেঃ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর করার কথা বলা ছিল। দৃশ্যমান বাস্তবায়ন অগ্রগতি কোনটিই নেই।

পাঁচ।
জাতীয় শিক্ষানীতির ঘোষণানুযায়ী, সকল স্তরের শিক্ষকের জন্য সতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলা হলেও বাস্তবে কোন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। উপরন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের ন‍্যয়সংগত যৌক্তিকভাবেই প্রাপ‍্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অথচ এই বেসরকারি শিক্ষকরাই দেশের ৯৭% শিক্ষার দায়িত্ব পালনকারী এবং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে। বঞ্চনা ও বৈষম্যে নিমজ্জিত করে বেসরকারি শিক্ষকদের মনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়েছে এর ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সর্ব মহল থেকে দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, শিক্ষাকে বেসরকারি খাতে না রেখে, সকল এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে জাতীয়করণের। বিষয়টি সরকারের জ্ঞাত থাকার পরেও অদৃশ্য কারণে জাতীয়করণের বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করছে।

ছয়।
শিক্ষানীতির আলোকে দেশে একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এমন কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি।

সাত।
শিক্ষার মানোন্নয়নে গুনগত শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে শিক্ষানীতিতে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে পিএসসির আদলে কমিশন গঠনের বলা ছিল। অথচ গভর্নিং বডি ও ম‍্যানেজিং কমিটির নিকট শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেয়ার অনৈতিক সুবিধা লাভের আশায় সুপারিশ করা হয়েছে। এখানেও আমলাদের অবহেলা ও উদাসীনতায় কার্যকর বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অথচ অধিকাংশই মনে করি এনটিআরসিএ উপর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা থাকুক।

পরিশেষে মূল্যায়ন হলো শিক্ষানীতির মূল বিষয়গুলোই বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষানীতির অনেকগুলো বিষয় আছে, যেগুলো বাস্তবায়নে শিক্ষা আইন অপরিহার্য ছিল।  অবশ‍্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ও রহস্যজনক কারণেই শিক্ষা আইনটি প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষা আইন প্রণয়নের জন্য কমিটি বিগত সাত বছরে খসড়ার কাটা ছেঁড়াই শুধু করেছেন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। সরকারের সদিচ্ছার একটি শিক্ষানীতি উপেক্ষিত হয়েছে উদাসীনতায়। তাঁর পরও জাতির প্রত্যাশা আমাদের আগামী প্রজন্মকে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে সক্ষম হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। সকল সমস্যার সমাধান করে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত মানের সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়।

সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ