বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ কতটা সত্যি?

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
বুধবার, ৪ জুলাই, ২০১৮, ১:০৭ পূর্বাহ্ন
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদৃষ্টি অনলাইন।।

দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক ও প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতারা হঠাৎ করে খুব ঘন ঘন দিল্লি যাতায়াত শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই দলের নেতারাই সম্প্রতি ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন, মতবিনিময় করছেন।

এ দেশে এমন একটা ধারণা আছে যে এ দেশের নির্বাচনে ভারত সবসময় একটা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবেও ঘটনাটা তাই কি না—এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদক প্রশ্ন করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমারকে, তখন তিনি স্পষ্টভাবে তা নাকচ করে দিয়েছিলেন।

সে সময় রবীশ কুমার বলেছিলেন, ‘বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো দেশে নির্বাচন হোক না কেন, সেটা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যাপার—সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নাক গলানোর কথা ভারত কখনো স্বপ্নেও ভাবে না। ঘরের পাশে বাংলাদেশের জন্যও একই কথা খাটে।’

সম্প্রতি বাংলাদেশের দুই প্রধান দলই যেভাবে দিল্লির সমর্থন আদায়ের জন্য সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছে, তাতে এই ধারণাটাই জোরালো হচ্ছে যে, দেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে ভারতের একটা ভূমিকা অবশ্যই আছে।

ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী এটাকে নাক গলানো বলতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, ভারত অবশ্যই ঢাকাতে নিজেদের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায়।

পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রভাব যদি বলেন তাহলে এটুকু অবশ্যই বলব কোন সরকার সে দেশে ক্ষমতায় আসলে আমাদের সাথে বন্ধুত্ব বাড়বে, সেই বিবেচনায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হয়তো থাকে। কোন সরকার এলে আমাদের সুবিধে হবে, আমাদের প্রোজেক্টগুলো ঠিকমতো চলবে, এটা অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর থাকে।

আর সেই দিক থেকে দেখলে যদি আওয়ামী লীগ আর বিএনপি’র মধ্যে তুলনা করে একটা ব্যালান্স শিট তৈরি করা হয়, তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে আওয়ামী লীগের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সদ্ভাব বাড়ে, কাজও ভালো হয়। অন্যদিকে বিএনপির একটা ভারতবিরোধী দৃষ্টিকোণ এখনো আছে, আর পাকিস্তানপন্থি শক্তি জামায়াতের সঙ্গে তাদের আঁতাতও আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা এইচ টি ইমামা  এ সপ্তাহেই দিল্লিতে যাবেন ভারত সরকারের সংস্থা আইসিসিআরের প্রধান ড. বিনয় সহস্রবুদ্ধের আমন্ত্রণে।

ক্ষমতাসীন বিজেপির এই সহ-সভাপতি তথা এমপি বিবিসিকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই ভারতের সঙ্গে কেন সুসম্পর্ক চাইছে তার কারণ বোঝা শক্ত নয়।’

বিজেপির এই ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বর্তমান সরকার যে আন্তরিকতা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছে, তাতে শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিকরা নন, সে দেশের মানুষজনরাও মুগ্ধ। ফলে এটা স্পষ্ট যে সে দেশের ভোটাররাও এমন দলকেই ক্ষমতায় দেখতে চান, যারা ভারতের সঙ্গে একটা প্রাণবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলবে।’

অর্থাৎ বিজেপি মনে করছে, ভারতবিরোধিতা নয়, বরং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কই এখন বাংলাদেশের দলগুলোকে নির্বাচনি ফায়দা দেবে—এই ধারণা থেকেই দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে।

বিএনপি এটাও বিশ্বাস করে যে ভারতের জোরালো সমর্থনের সুবাদেই শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারছে।

যদিও পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী জানান, সেটাই হাসিনার সরকারের টিকে যাওয়ার একমাত্র কারণ হতে পারে না। তার কথায়, ‘হ্যাঁ, ভারত শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেছে ঠিকই, কিন্তু তার সরকারের একটা জোরালো সাংবিধানিক বৈধতা ছিল, এটাও মনে রাখতে হবে। কেউ একটা নির্বাচন বয়কট করলেই সেটা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যেতে পারে না।’

পছন্দের সরকারকে সমর্থন দিলেও ভারত বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়াতেও হস্তক্ষেপ করে থাকে বলে বাংলাদেশে যে প্রচার আছে, তাকে অবশ্য মোটেই আমলে নিতে রাজি নন তিনি।

পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রচার তো ওখানে অনেকেই অনেক কিছু করে, তা তো আর আমরা রুখতে পারব না। কিন্তু আমি যত দূর জানি ভারত বাংলাদেশের নির্বাচনে কখনো সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। প্রভাব খাটানো বলতে ভারত হয়তো বড়জোর নিজের পছন্দের সরকারকে চেয়েছে—যাতে কোনো অন্যায় নেই। দুনিয়ার সব দেশই তাই করে, আর সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিরই অংশ ।

অর্থাৎ ভারতের পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে ভারতের যেটুকু প্রভাব, তা মনস্তাত্ত্বিক বা কূটনৈতিক; সেখানে পছন্দের দলকে ভোটে জিততে সাহায্য করবে আগ বাড়িয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ ভারত নেয়নি বা নেবে না।

 

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ