অসহায়ের সহায় গ্রাম আদালত, ২০ টাকা দিয়ে সত্তর হাজারটাকা ফেরত পেল আরিফা

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯, ১০:৫৪ পূর্বাহ্ন

নিকোলাস বিশ্বাস।।

মামলার আবেদনকারীর পরিচিতি:

মোসাম্মৎ আরিফা আক্তার। বয়স আনুমানিক ৩৫ গ্রাম- সোনাকান্দা, ইউনিয়ন- দৌলতপুর, উপজেলা- দাউদকান্দি, জেলা- কুমিল্লা। ৪ বোন ও বাবা মা সহ মোট ৬ জনের সংসার। পেশায় একজন কিন্ডারকাডেন স্কুল শিক্ষক। তাঁর বাবা একজন দিনমজুর ও মা গৃহিনী। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি টিউশনি করেন। তার মা বাড়িরকাজের পাশপাশি বিভিন্ন হাতের কাজ করে থাকেন। যেমন- কাঁথা সেলাই, মোড়া তৈরী, কুলা ও ডালা তৈরী ইত্যাদি।

মামলার প্রতিবাদীর পরিচিতি:

মোঃ সুফি আহাম্মদ (রনি), গ্রাম- পাটন, ইউনিয়ন- নায়েরগাঁও দক্ষিণ, উপজেলা- মতলব দক্ষিণ, জেলা- চাঁদপুর। তিনি সৌদি-আরব প্রবাসী।

বিরোধের সূত্রপাত:

আবেদনকারী ও প্রতিবাদী সম্পর্কে খালাতো ভাইবোন। আবেদনকারী মোসাম্মৎ আরিফা আক্তার প্রায় ২বছর পূর্বে প্রতিবাদী মোঃ সুফি আহাম্মদ (রনি) কে তার বাবাকে বিদেশ নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেন। রনি তাকে বলেন যে, বিদেশযেতে হলে প্রথমে পাসপোর্ট করতে হবে। আরিফা তার কথায় রাজি হয়ে বাবার জন্য পাসপোর্ট করে রনিকে জানায়। রনি সৌদি-আরব থেকে আরিফাকে ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা দিতে বলে। রনির কথা মতো আরিফা ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা দেয়।এরপর রনি ভিসা প্রস্তুত হয়েছে বলে আরো ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা চান এবং তার বাবাকে কিছু দিনের মধ্যেই বিদেশেনিয়ে যাবে বলে তাকে জানায়। আরিফা রনির কথা মতো আরো ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা দেয়। কিন্তু রনি তার বাবাকেবিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে টাল-বাহানা শুরু করে। এভাবে প্রায় ২ বৎসর পার হয়ে যায়। বিদেশে নিচ্ছেও না আবার টাকাও ফেরতদিচ্ছে না। এরপর রনি গত ০৪/১১/২০১৮ তারিখে বাংলাদেশে আসে। আরিফা বিষটি জানতে পেরে তার বাবাকে সাথে নিয়েতাৎক্ষণিকভাবে রনির সঙ্গে দেখা করে তার টাকা ফেরত চান। কিন্তু রনি টাকা ফেরৎ দিতে অস্বীকার করেন।

গ্রাম আদালতের ধারণা লাভ: বাংলাদেশ সরকার ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ইউএনডিপি এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পের মূল ভিত্তি হচ্ছে: গ্রাম আদালত আইন২০০৬ (সংশোধন ২০১৩) এবং গ্রাম আদালত বিধিমালা ২০১৬। এ আইন বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষবিশেষ ক’রে নারী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ অল্প সময়ে ও স্বল্প ব্যয়ে সঠিক বিচার পাবেন। এ প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদেরচেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, সচিব ও গ্রাম পুলিশদের গ্রাম আদালত বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালারআয়োজন করা হয়। এছাড়াও জনসচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গ্রাম আদালত বিষয়কউঠান-সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আরিফা আক্তার বিষয়টি রনির সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্যকে জানান। বিষয়টি শুনে ইউপি সদস্য আরিফাকেইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেন। আরিফা উক্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমেআরো জানতে পারেন যে, তাদের ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং সেখানে মামলা করলে ন্যায়-বিচার পাওয়া যায়। মামলার জন্য মাত্র ১০ টাকা অথবা ২০ টাকা ফি দিতে হয়। এই আদালতে কোন আইনজীবি নিয়োগ করা লাগেনা। মামলার খরচ খুবই কম হওয়ায় মোসাম্মৎ আরিফা আক্তার রনির ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে সরাসরি গ্রাম আদালতে মামলাকরার সিদ্ধান্ত নেন।

গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের: ইউপি সদস্যের কথা মতো, আরিফা ৫/১২/২০১৮ তারিখে রনি’র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদেআসেন এবং গ্রাম আদালত সহকারী রিমা আক্তারের সঙ্গে দেখা করেন। আরিফা তাকে বিষয়টি বিস্তারিত বলেন। বিষয়টি গ্রামআদালতের আওতাভূক্ত বিধায় রিমা আক্তার তাকে গ্রাম আদালতে অভিযোগ দায়েরের পরামর্শ দেন। ঐ দিনই আরিফা আক্তার২০ টাকা ফি প্রদান সাপেক্ষে গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করেন।

গ্রাম আদালতের বিচার প্রক্রিয়া: আদালত সহকারী রিমা আক্তার দাখিলকৃত অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকেঅবহিত করেন। চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুস সালাম মৃধা অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে দেখেন এবং আদালত সহকারীকে১১/১২/২০১৮ তারিখে দিন ধার্য করে প্রতিবাদীর প্রতি সমন জারী ও আবেদনকারীকে মামলার স্লিপ দেওয়ার নির্দেশ দেন।আদালত সহকারী যথানিয়মে গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে সমন জারী ও মামলার স্লিপ প্রদান করেন।

নির্ধারিত তারিখে আবেদনকারী ও প্রতিবাদী আদালতে উপস্থিত হন এবং হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। এরপর তারা উভয়ই ইউপিচেয়ারম্যান মোঃ আব্দুস সালাম মৃধার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রতিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট ৭০,০০০ (সত্তর হাজার) টাকা নেওয়াকথা অকপটে স্বীকার করেন এবং ঐদিনই চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা আবেদনকারীকে প্রদান করেন।আর বাকি ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা প্রদানের জন্য চেয়ারম্যানের নিকট ৬ দিনের সময় প্রার্থনা করেন। চেয়ারম্যানপ্রতিবাদীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে এবং আবেদনকারীর সাথে আলোচনা সাপেক্ষে তার জন্য মোট ৬দিনের সময় মঞ্জুর করেন।

৬ দিন পর অর্থ্যাৎ ১৭/১২/২০১৮ তারিখে প্রতিবাদী মোঃ সুফি আহাম্মদ (রনি) মামলার দাবীকৃত অবশিষ্ট ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে আসেন এবং চেয়ারম্যানের সাক্ষাতে আবেদনকারী মোসাম্মৎ আরিফা আক্তারকে বুঝিয়ে দেন।এরপর উভয়ে আদালতের নির্ধারিত আপোষনামা ফরমে স্বাক্ষর করেন। এভাবে সংঘঠিত অপরাধ ইউপি চেয়ারম্যানের সামনেস্বীকার করা ও শতভাগ দাবী মিটিয়ে দেওয়ায় মামলাটি গ্রাম আদালত বিধিমালা ২০১৬ -এর বিধি ৩১ অনুযায়ী নিস্পত্তি হয় এবংপ্রয়োজনীয় সকল নথি সংরক্ষণের আদেশ তামিল হয়।

আবেদনকারীর প্রতিক্রিয়া: আবেদনকারী মোসাম্মৎ আরিফা আক্তার স্বল্প সময়ে এবং অল্প খরচে সহজেই ন্যায়-বিচার পেয়েগ্রাম আদালতের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, “গ্রাম আদালত থাকায় আমি খুব সহজে আমার পাওনা টাকা আদায় করতেপেরেছি। আমি কখনো ভাবিনি যে, আমার ইউনিয়নের বাইরে অন্য ইউনিয়নে মামলা দায়ের করে এরূপ ন্যায়-বিচার পাব।” একজন নারী হিসেবে আমি যখন উক্ত গ্রাম আদালতে যাই তখন সেখানেও আমি আদালত সহকারী হিসেবে একজন নারীকে পাইযা আমাকে আরো আশাবাদী করে তোলে। শুধু তাই নয়, আমি আদালত সহকারীর কাছে আমার বিরোধের বিষয়টি অতি স্বাচ্ছন্দেবলি এবং তিনিও মনযোগ সহকারে আমার কথা শোনেন। তিনি এই আশাবাদ ব্যাক্ত করেন যেন গ্রাম আদালত স্থায়ীভাবে এরকার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

বিচারিক-সেবা মূল্যায়ন: হিসেব অনুযায়ী এক দিনের মধ্যেই মামলাটি নিস্পত্তি হয় এবং ৬ দিনের মধ্যে মামলার আদেশশতভাগ বাস্তবায়িত হয়। মামলাটির জন্য আবেদনকারীকে মোট ৩ বার আদালতে আসতে হয়েছে। এরমধ্যে, মামলা দায়েরেরজন্য একদিন, মামলায় হাজিরার জন্য একদিন এবং দাবীকৃত টাকা গ্রহণের জন্য আরো একদিন তাকে আদালতে আসতেহয়েছে। বিচার পাবার জন্য মামলার ফিস বাবদ আবেদনকারীর খরচ হয়েছে মাত্র ২০ (বিশ) টাকা যেহেতু মামলাটির ধরণদেওয়ানী প্রকৃতির। তাই বলা যায় যে, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য অতি সহজে ও স্বল্প সময়ে ন্যায়-বিচার পাওয়ার আশ্রয়স্থলহয়ে উঠছে চাঁদপুরের গ্রাম আদালতগুলো।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ