আদর্শবাদী রাজনীতি বনাম রাষ্ট্রনৈতিক রাজনীতি

মাসুম খলিলী
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ১১:০৪ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। একদিকে আছে আদর্শবাদী রাজনীতি—যেখানে লক্ষ্য হলো সমাজকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বা ধর্মীয় দর্শনে রূপান্তর করা; অন্যদিকে রাষ্ট্রনৈতিক রাজনীতি—যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা, প্রশাসন, নীতি ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার হিসাব-নিকাশ প্রধান। এই দুই ধারার টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দর্শনে।

জামায়াতের জন্মভাবনা মূলত আদর্শভিত্তিক। তাদের রাজনীতির কেন্দ্রে আছে ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ তাদের কাছে রাজনীতি ক্ষমতার খেলা নয়; বরং ‘দাওয়াত’ ও ‘সংস্কার’-এর ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই জায়গায় তারা প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলোর থেকে আলাদা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্র গঠিত হয় সংবিধান, নির্বাচন, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও বহুত্ববাদী সমাজ কাঠামোর ওপর। ফলে আদর্শবাদী লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিতে এলেও ক্ষমতায় যেতে হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, জোটনীতি, নির্বাচন-সমঝোতা—এসব গ্রহণ করতে হয়। এখানেই আদর্শবাদ ও রাষ্ট্রনৈতিক রাজনীতির সংঘাত তৈরি হয়।

জামায়াতের রাজনীতিতে আমরা এই দ্বৈততা স্পষ্ট দেখি। একদিকে তারা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ বা ‘নৈতিক সমাজ’ গঠনের কথা বলে; অন্যদিকে সংসদীয় নির্বাচন, জোট সরকার, মন্ত্রিত্ব—এসব রাষ্ট্রনৈতিক বাস্তবতায় অংশ নেয়।

এই অংশগ্রহণ দেখায় যে, তারা বিপ্লবী বা সশস্ত্র পথ নয়, বরং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের কৌশল বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ তাদের কৌশল হলো—ব্যবস্থার ভেতর ঢুকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা। এটিকে বলা যায় ‘ইনক্রিমেন্টাল আইডিওলজিক্যাল পলিটিক্স’।

তবে এখানেই প্রশ্ন ওঠে—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি একক ধর্মভিত্তিক আদর্শ কতটা কার্যকর? বাংলাদেশ একটি বহুস্তরীয় সমাজ—ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, মতাদর্শের বৈচিত্র্যে ভরা। ফলে একমাত্রিক আদর্শ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে বাস্তবতায় সংঘাত তৈরি হয়। এই জায়গায় আদর্শবাদী দলগুলোকে সমঝোতা করতে হয়—সংবিধান, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে।

ফলে দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পথে আদর্শ ধীরে ধীরে কৌশলে রূপ নেয়। স্লোগান নীতিতে পরিণত হয়, আর নীতি প্রশাসনিক বাস্তবতায় আপস করে। এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় দল তাদের মূল আদর্শ নিয়ে ঝুঁকিতেও পড়ে। ইতিহাসে বহু আদর্শবাদী দল (তুরস্কের একে পার্টি ও তিউনিশিয়ার আন নাহদা) ক্ষমতায় গিয়ে প্রাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী হয়ে গেছে—জামায়াতও এই দ্বন্দ্বের বাইরে নয়।
আমার দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনটি স্তর গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমত আদর্শ, যা দিকনির্দেশনা দেয়;
দ্বিতীয়ত কৌশল, যা ক্ষমতায় পৌঁছায়; তৃতীয়ত প্রশাসনিক দক্ষতা, যা রাষ্ট্র চালায়।

জামায়াতের শক্তি প্রথম স্তরে—আদর্শিক সংগঠন ও শৃঙ্খলায়। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে—গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে—তাদের সক্ষমতা সবসময় পরীক্ষার মুখে।

সারকথা, জামায়াতের জন্মভাবনা আদর্শবাদী হলেও তাদের রাজনৈতিক পথ রাষ্ট্রনৈতিক। তারা বিপ্লব নয়, ব্যালটকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু ব্যালটের রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে কেবল আদর্শ যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন বাস্তবতা, সমঝোতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রদর্শন।
এই দ্বন্দ্বই জামায়াতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় পাঠ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ