পাটকেলঘাটায় ১২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাকে মাদক উদ্ধার ও মামলা হিসাবে চালিয়ে দেওয়ায় সদ্য বরখাস্ত হওয়া সাবেক জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আলতাফ হোসেন গোটা সাতক্ষীরায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আটক করে ঘুস না পেয়ে তিনি ক্রসফায়ারের নাটকও সাজিয়েছিলেন। ক্রসফায়ারে নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা রয়েছেন।
এছাড়া তার প্ররোচনায় সাতক্ষীরা শহরতলীর কুখরালির হোমিও ডাক্তার মোকলেসুর রহমান জনিকে গুম করার অভিযোগ রয়েছে। সাতক্ষীরায় আলতাফ হোসেন এসপির দায়িত্বে থাকাকালে ১২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধারসহ বেশ কয়েকটি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। আর এসব স্বর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২৬ জুলাই ঝিনাইদহ থেকে বদলি হয়ে সাতক্ষীরায় এসপি পদে যোগ দেন আলতাফ হোসেন। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সিলেট রিজিওনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার পদে বদলি করা হয়। এ পদে থাকাকালে বুধবার তাকে ১২০ ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের ঘটনায় চাকরিচ্যুত করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে তার চাকরিচ্যুতির বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব আখতার হোসেন স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপন ‘অবিলম্বে কার্যকর হবে’ বলে উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর ভারতে পাচারের উদ্দেশে খুলনার সোনাডাঙা থেকে স্বর্ণ চোরাচালানি বিপ্লব চ্যাটার্জী সাতক্ষীরায় বাসে আসছিলেন। গোপনসূত্রে খবর পেয়ে ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডু থানার এএসআই আব্দুর রউফ পল্টু (পাটকেলঘাটার বাসিন্দা) ও কনস্টেবল মারুফ তাকে পথিমধ্যে আটক করে স্থানীয় সেনেরগাঁতী বাজারে নিয়ে যান।
এ সময় তার কাছ থেকে স্বর্ণ ছিনতাই করার চেষ্টা করলে বাজারের লোকজন পুলিশের দুই সদস্যকে গণপিটুনি দেন এবং স্বর্ণ বহনকারী বিপ্লবসহ তাদের পাটকেলঘাটা থানায় সোপর্দ করেন। এ সময় বিপ্লবের কাছ থেকে উদ্ধার ১২০ ভরি স্বর্ণের ব্যাপারে ওসি মহিবুল ইসলাম তৎকালীন এসপি আলতাফ হোসেনকে অবহিত করেন। বিপ্লবের কাছ থেকে জব্দ ১২০ ভরি স্বর্ণ সন্ধ্যায় আলতাফ নিজের জিম্মায় নেন এবং পুলিশের দুই সদস্যকে ছেড়ে দেন। এর একদিন পর ২১১ পিস ইয়াবা দিয়ে বিপ্লবকে তিনি চালান দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ ব্যাপারে তখন জানতে চাইলে এসপি আলতাফ স্বর্ণ আটকের বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটি না করে বলেন, তদন্ত করে রিপোর্ট দেব। অথচ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি সেই রিপোর্ট দেননি। এ ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের চাকরি থেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছে। শুধু বিপ্লব চ্যাটার্জির কাছ থেকে উদ্ধার স্বর্ণ নয়, আরও অনেক ঘটনায় উদ্ধার স্বর্ণ সাবেক এসপি আলতাফ আত্মসাৎ করেছেন।
২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি শহরের তুফান মোড়ে আধুনিক জুয়েলার্স ও অদ্রি জুয়েলার্সে ভয়াবহ চুরির ঘটনায় ৩১৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও আড়াই লাখ টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আটক বকচরা গ্রামের দাগি চোর নবাব আলী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
আদালতে তিনি জানান, তাকে আটকের সময় তিনি ৩১৫ ভরি স্বর্ণ সাতক্ষীরা সদর থানার এসআই আসাদুজ্জামানকে দিয়েছেন। কিন্তু আসাদুজ্জামানের কাছ থেকে সেই স্বর্ণ উদ্ধার হয়নি। সেসময় প্রচার হয়েছিল এ স্বর্ণের একটা বড় অংশ এসপি আলতাফ হোসেনের পকেটে চলে গেছে। একই বছরের ১৯ মার্চ মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে দুই স্বর্ণ কারিগর সাতক্ষীরার এক জুয়েলার্সের অর্ডার অনুযায়ী ২০০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে আসছিলেন। শহরের পলিটেকনিক মোড়ে গোয়েন্দা পুলিশের আবুল কাশেম, বোরহান উদ্দিন ও এসআই নাসির তাদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ওই স্বর্ণ কেড়ে নেয়। এরপর স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। তারাও স্বর্ণ ফিরে পাননি।
২০১৬ সালের ৮ আগস্ট রাতে সাতক্ষীরা শহরতলীর কুখরালির হোমিও ডাক্তার মোকলেসুর রহমান জনিকে এসআই হিমেল ধরে নিয়ে যান। এ খবর পেয়ে তার বাবা রাশেদ ও স্ত্রী জেসমিন থানায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং তাকে খাবার দেন। তাকে ছেড়ে দিতে তিনদিন পর তার পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় চতুর্থ দিন পরিবারকে জানানো হয়-জনি নামে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
এরপর তার স্ত্রী জেসমিন নাহার সংবাদ সম্মেলন করে স্বামীর মুক্তি দাবি করেন। এ বিষয়ে থানায় জিডি করার চেষ্টা করলেও পুলিশ নেয়নি। হাইকোর্ট দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়ে জনিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেও তৎকালীন এসপি আলতাফ এক প্রতিবেদনে জানান, জনি ‘আল্লাহর দলের’ সদস্য। আমরাও তাকে খুঁজছি। জনিকে শিবিরের লোক হিসাবে আখ্যায়িত করেও আলতাফ হোসেন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময় তিন পুলিশ কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলির পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চললেও নানা কারণে তা থমকে যায়।
২০১৭ সালের ১২ মার্চ তালায় বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির বিদ্যুৎ বাছাড় ও আবু তালহা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। একই বছরের ১০ এপ্রিল যুবলীগ নেতা রাসেল কবিরের লাশ রাজারবাগান কলেজ মোড়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আশাশুনির আনুলিয়া ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ কর্মী ইউনুস আলী কথিত বন্দুকযুদ্ধে যশোরের সাগরদাঁড়ি রোডে নিহত হন।
এ চারটি ক্রসফায়ার সম্পর্কে অভিযোগ-তাদের আটক করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে এসপি আলতাফ ঘুস আদায়ে ব্যর্থ হওয়ায় ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়েছিলেন। এ বিষয়ে জানতে এসপি আলতাফ হোসেনকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময় তাকে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাতে তিনি সাড়া দেননি।
You must be logged in to post a comment.