কুরবানির আমল ও ফযিলত

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১৮, ১০:১৬ অপরাহ্ন

কুরবানি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ। কেননা বান্দাহ কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে। কুরবানি শব্দটি কুরবুন শব্দ থেকে উৎকলিত। অর্থাৎ নিকটবর্তী হওয়া, সান্নিধ্য লাভ করা। যেহেতু আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার মাধ্যম হল কুরবানি তাই এর নাম কুরবানির ঈদ। এই দিনে ঈদ পালন করা হয়ে থাকে এজন্য একে কুরবানির ঈদ বলে।

এ ঈদের অপর নাম ঈদুল আজহা। আরবি শব্দ আদহা অর্থ কুরবানির পশু, যেহেতু এই দিনে কুরবানির পশু যবেহ করা হয়, তাই একে ঈদুল আজহা বলা হয়। কুরবানির গুরুত্ব : কুরবানি হলো ইসলামের একটি শিয়ার বা মহান নিদর্শন। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন : ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কুরবানি কর।’ [সূরা আলকাওসার : ২]। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করা সুন্নাহর পরিপন্থী কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে। [মুসনাদ আহমাদ, ইবন মাজাহ- ৩১২৩ হাদীসটি হাসান] যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদীস একটি সতর্কবাণী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানি করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “হে লোক সকল, প্রত্যেক পরিবারের ওপর কুরবানি দেয়া অপরিহার্য।” [সুনান ইবন মাজাহ-৩১২৫, হাদীসটি হাসান]। কুরবানির ইতিহাস : কুরবানি আল্লাহ তাআলার একটি বিধান। আদম আলাইহিস সালাম হতে প্রত্যেক নবীর যুগে কুরবানি করার ব্যবস্থা ছিল। যেহেতু প্রত্যেক নবীর যুগে এর বিধান ছিল সেহেতু এর গুরুত্ব অত্যধিক। যেমন ইরশাদ হয়েছে : ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদের জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। [সূরা আলহাজ্জ-৩৪] আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীমকে তার রবের কয়েকটি বাণী দিয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর সে তা পূর্ণ করল। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে নেতা বানাবো’। [সূরা আলবাকারাহ-১২৪] নিজ পুত্র যবেহ করার মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম।

এ বিষয়ে সূরা আস-সাফ্ফাতের ১০০ থেকে ১০৯ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থ : তিনি বললেন, হে প্রভু! আমাকে নেক সন্তান দান করুন। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম এক অতীব ধৈর্যশীল সন্তানের। পরে যখন সে সন্তান তার সাথে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়ানোর বয়সে পৌঁছলো তখন তিনি (ইবরাহীম আ:) একদিন বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি আল্লাহর হুকুমে তোমাকে যবেহ করছি এখন তুমি চিন্তা-ভাবনা করে দেখ এবং তোমার অভিমত কী? তিনি (ইসমাঈল) বললেন, হে পিতা আপনি তাই করুন যা করতে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। অতঃপর যখন দু’জনই আল্লাহর আদেশ মানতে রাজি হলেন, তখন তিনি (ইবরাহীম আ.) পুত্রকে যবেহ করার জন্য শুইয়ে দিলেন। আমি তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই নেক বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটি বড় পরীক্ষা। আর আমি তাকে বিনিময় করে দিলাম এক বড় কুরবানির দ্বারা এবং তা পরবর্তীর জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহীম (আ.) এর উপর।’ একমাত্র আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় এবং আল্লাহ প্রদত্ত কঠিনতম পরীক্ষায় সাফল্যজনকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যে এক মহান পিতার প্রাণাধিক পুত্রকে কুরবানি করার মধ্য দিয়ে ধৈর্যশীলতার উত্তম নমুনা পেশ পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। কুরআন মাজীদে উল্লেখিত আয়াতসমূহে ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমুস সালামের আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের সাবলীল বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে । উল্লেখিত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, স্বীয় পুত্র যবেহ না হয়ে দুম্বা যবেহ হওয়ার মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নির্ধারিত পশু কুরবানি দেয়ার বিধান দেয়া হয়। কুরবানির উদ্দেশ্য : কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইবাদত করার জন্য। তাই আল্লাহ তাআলার বিধান তাঁর নির্দেশিত পথে পালন করতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে : ‘আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদত করবে।’ [সূরা আয্যারিয়াত-৫৬] আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কুরবানির বিধান আমাদের উপর আসার বেশ কিছু উদ্দেশ্যও রয়েছে। এক. শর্তহীন আনুগত্য : আল্লাহ তাআলা তার বান্দাহকে যে কোন আদেশ দেয়ার ইখতিয়ার রাখেন এবং বান্দাহ তা পালন করতে বাধ্য। তাই তার আনুগত্য হবে শর্তহীন। আল্লাহর আদেশ সহজ হোক আর কঠিন হোক তা পালন করার বিষয়ে একই মন-মানসিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম মানার বিষয়ে মায়া-মমতা প্রতিবন্ধক হতে পারে না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর আনুগত্য ছিল শর্তহীন। এ জন্য মহান আল্লাহ যেভাবে বিশ্ব মানবম-লীকে বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত করেছেন ঠিক সেভাবে সর্বশেষ জাতি হিসেবে মুসলিম জাতির পিতাও মনোনয়ন দিয়েছেন। কুরআনে এসেছে : ‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।’ [সূরা আল-হাজ্জ-৭৮] দুই. তাকওয়া অর্জন : তাকওয়া অর্জন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। একজন মুসলিমের অন্যতম চাওয়া হলো আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানি দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। আলকুরআনে এসেছে : ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে। [সূরা আলহাজ্জ-৩৭]।তিন. ত্যাগ করার মহান পরীক্ষা : কুরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরি করা। আল্লাহর বিধান পালনে জান-মালের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কুরবানির ঈদকে গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত করা নয়, বরং নিজেদের মধ্যকার পশুসুলভ আচরণ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়াই কুরবানির উদ্দেশ্য। সূরা আলবাকারাহ-১৫৫নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ভয়, দারিদ্র্য, সম্পদ ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি করার মাধ্যমে পরীক্ষা করবো। কুরবানির ফযিলাত : ১. কুরবানিদাতা কুরবানির পশুর জবাই এর মাধ্যমে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের বাস্তবায়ন করতে পারে। আলকুরআনে আল্ল­াহ তাআলা বলেন, “আর আমরা মহা কুরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করেছি।” [সূরা আস-সাফফাত-১০৭] এ আয়াতের তাফসীরে তাফসীর বিশারদগণ উল্লেখ করেছেন, সকল কুরবানি এ মহাকুরবানির অন্তর্ভুক্ত। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ ইবনে আরকাম বর্ণিত হাদীসেও কুরবানিকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর সুন্নাত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। ২. কুরবানির রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্ম পরায়ণদেরকে।” [সূরা- আলহাজ্জ : ৩৭] ৩. কুরবানি আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিদর্শন। সূরা হজ্জের ৩৬নং আয়াতে আল্লাহ বলেন- অর্থাৎ কুরবানির উটসমূহকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনের অন্যতম করেছি। তোমাদের জন্য যাতে কল্যাণ রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দ-ায়মান অবস্থা এগুলোর উপর তোমরা আল্লাহর নাম স্মরণ করো আর যখন কাত হয়ে পড়ে যায় তখন সেগুলো হতে খাও। আর আহার করাও ধৈর্য্যশীল অভাবী ও ভিক্ষাকারী অভাবগ্রস্তকে এভাবে আমি ওদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। এ আয়াতে কুরবানির ফযিলত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং কুরবানির পশুকে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ৪.পশু দ্বারা কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর যিকির বা স্মরণের বাস্তবায়ন করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : অর্থাৎ আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি। তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। [সূরা : আলহাজ্জ-৩৪ ]৫.কুরবানির প্রবাহিত রক্ত আল্লাহ তাআলার কাছে দুটি কুচকুচে কালো ছাগলের চেয়ে প্রিয় ও পবিত্র। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে আবু হুরায়রা রাদি আল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন : অর্থাৎ কুরবানির প্রবাহিত রক্ত আল্লাহ তাআলার কাছে দুটি কুচকুচে কালো ছাগলের চেয়ে অধিক প্রিয়। [সুনান বায়হাকী] ৬. কুরবানির দিন আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করা।

লেখক 

চেয়ারম্যান

তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ