মক্কা বিজয় দিবস

অন্যদৃষ্টি অনলাইন
সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯, ৯:০৩ পূর্বাহ্ন

খন্দকার ফিরোজ আহম্মেদ।।

মুসলিম ইতিহাসে মক্কা বিজয় একটি অতি গুরুত্বপুর্ণ এবং তাৎপর্যপুর্ণ ঘটনা। আজ ২০ রমজান মক্কা বিজয় দিবস।

শুধু মুসলমানদের তো বটেই- বিশ্ব মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটি একটি অনন্য সাধারন ঘটনা। হিজরতের ৮ম বছরে মহানবী সাঃ ১০ হাজার মুসলিম সৈন্যের বাহিনী নিয়ে মক্কা জয় করেন।

মক্কা জয় শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটা অনেক ঘটনা, অনেক রক্তপাত অনেক ত্যাগের ফসল। মহানবী সাঃ এর নবুওয়াতের পর মুসলমানদের সংগ্রামের শুরু, বদরে এই সংগ্রাম যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। এরপর ওদুদের যুদ্ধ খয়বরের যুদ্ধ ইত্যাদি অনেক ছোট বড় ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বলা হয়ে থাকে হোদাইবিয়ার সন্ধিতেই মক্কা বিজয়ের বীজ লুকিয়ে ছিলো। বিষয়টা আসলেই তাই। হোদাইবিয়ার সন্ধির শর্ত মোতাবেক বনী খোজায়া গোত্রের উপর কেউ আক্রমন করতে পারবে না। এই শর্তের কারনে খোজায়া গোত্র অস্ত্র পরিত্যাগ করেছিলো। এ অবস্থায় কোরাইশ বাহিনী তাদের উপর আক্রমন করে সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে। এই করুণ ঘটনাকে খোজায়া গোত্রের বিখ্যাত কবি করুণ আর্তনাদে তাঁর শোকগাঁথায় বলছেনঃ “কোরেশ আপনার সহিত প্রতিজ্ঞা করিয়া তাহা ভঙ্গ করিয়াছে আপনার সেই সুদৃঢ় সন্ধি শর্তগুলি তাহারা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে. . .

‘অতিরে’ ঘুমন্ত অবস্থায় তাহারা আমাদিগকে আক্রমন করিয়াছিল এবং শায়িত অবস্থায়, ভূপতিত অবস্থায় ও উপবিষ্ট অবস্থায় তাহারা আমাদিগকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়াছিলো. . ”

এই ঘটনার পর মহানবী সাঃ কোরেশদেরকে এই ফরমান পাঠালেন যে, খোজায়া গোত্রের উপর অন্যায় হত্যার অর্থদন্ড দিতে হবে অথবা কোরাইশরা বনি বকর গোত্রের মিত্রতা পরিত্যাগ করুক অথবা ঘোষণা করা হোক যে, হোদাইবিয়ার সন্ধি ভেঙ্গে গেছে। কোরাইশরা শেষেরটা মেনে নিলো। মোহাম্মদ সাঃ মক্কা বিজয়ের সংকল্প করেন। এ ছাড়া আরো অনেক কারণ ছিলো।

হায় মক্কা, হায়রে মাত্রভূমি! আটবছর আগে এই মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরতে যাবার সময় মহানবী সাঃ বারবার পেছন ফিরে মক্কার দিকে তাকাচ্ছিলেন আর চোখের পানি ফেলছিলেন। সেই মক্কায় নিজের মাতৃভূমিতে প্রবেশ করছেন তিনি আজ একই রাস্তায়। আজ ২১ বছর পর বিজয়ীর বেশে দশহাজার সৈন্য নিয়ে প্রবেশ করছেন তিনি, কিন্তু বিজয়ী নেতার গর্ব অহঙ্কার দম্ভ কোথায়? বিনয়ে তাঁর মাথা যে নত হয়ে আসছে! মক্কার দাম্ভিক সব নেতা, নারী পুরুষ যারা মোহাম্মদ সাঃ এবং তাঁর অনুসারীদের উপর সীমাহীন অত্যাচার করেছিলো, তারা অধবদনে নবী সাঃ এর দিকে চেয়ে আছে। তিনি কারো সাথে প্রতিশোধ মূলক আচরণ করলেন না। বন্দী আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা করে দিয়ে বললেন, “যাও, তোমাদেরকে পুনরায় ক্ষমা করিলাম, পুনরায় অভয় দিলাম”।… আবু সুফিয়ান! তুমি মক্কাবাসীদিগকে অভয় দাও, আজ তাহাদিগের প্রতি কোনই কঠোরতা হইবে না, তুমি আমার পক্ষ হইতে নগরময় ঘোষণা করিয়া দাওঃ ১. যে ব্যাক্তি অস্ত্র ত্যাগ করিবে- তাহাকে অভয় দেওয়া হইল। ২. যে ব্যাক্তি কাবায় প্রবেশ করিবে সে অভয়প্রাপ্ত। ৩. যাহারা নিজেদের গৃহদ্বার বন্ধ করিয়া রাখিবে, তাহাদিগের কোন ভয় নাই। ৪. যাহারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করিবে, তাহারা অভয়প্রাপ্ত।” (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃ- ৫৪৩)

আমরা চেঙ্গিস খান হালাকু খানের যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস জেনেছি- জয়ের পর তারা নগরের পর নগর মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে, মানুষের মাথার খুলী দিয়ে পিরামিড বানিয়েছে। আমরা ইরাকে দেখেছি বুশ বাহিনী কীভাবে ইরাককে ধ্বংশ করেছে, নীরিহ নারী পুরুষ শিশুকে হত্যা করেছে। আমরা আফগানিস্তানের হত্যাকান্ড দেখেছি, ফিলিস্তিনের ধ্বংশযজ্ঞ দেখেছি, চীন থেকে উইঘুর মুসলমানদের বিতাড়ন দেখেছি।

আমরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যার দৃশ্য দেখেছি এবং এখনো দেখছি। যারা বলে ইসলাম জঙ্গীবাদ সাপোর্ট করে, তারা দেখুক,- তুলনা করুক মক্কা বিজয় আর বর্তমানে দেশে দেশে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায় যুদ্ধ, অন্যায় হত্যাকান্ড। মক্কা বিজয় থেকে সবার শিক্ষা গ্রহন করা উচিৎ।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ