রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগের ইসলামাবাগ এলাকায় স্যান্ডেলের কারখানায় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট, র্যাব-পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত চেষ্টায় ৩ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখার সময় সকাল পৌনে ৭টার দিকেও ভবনটি থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিস বলছে, আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘটনাস্থলে কাজ করবেন।
শনিবার (২৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৬টায় এক ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন জানান, রাত সাড়ে ৩টায় লালবাগের ওই ভবনে আগুন লাগে। সেখানে এশিয়া রাবার ইন্ডাস্ট্রি নামের একটি কারখানায় স্যান্ডেল তৈরি করা হতো। আগুনের ঘটনায় প্রথম রেসপন্ডার ছিল লালবাগ ফায়ার স্টেশন। এরপর পলাশী, সিদ্দিকবাজার এবং হাজারীবাগ থেকে আরও ইউনিট এসে যোগ দেয়। সকাল ৬টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পুরোপুরি নির্বাপণ হতে আরও সময় লাগবে।
তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন, পুরান ঢাকায় কোথাও আগুন লাগলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অনেক দূরে গাড়ি রেখে এসে আমাদের এসে কাজ করতে হয়েছে। আশপাশে কোথাও পানির সোর্স নেই। আমরা বুড়িগঙ্গায় একটা পাম্প বসিয়ে বিশেষ পানিবাহী গাড়ির মাধ্যমে এ পর্যন্ত পানি এনেছি। এছাড়া এখানে যত্রতত্র বিদ্যুতের তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় আগুন ছড়ানোর আশঙ্কা ছিল, কিন্তু আগুন বড় আকার ধারণ করার আগেই আমরা সবার সহযোগিতায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, ভবনটি আবাসিক নাকি বাণিজ্যিক, সেটি পরবর্তীতে কাগজপত্র দেখে বোঝা যাবে। আমরা তদন্ত কমিটি করে আগুনের কারণ অনুসন্ধান করব। আপাতত কোনো ঝুঁকি নেই।
এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে ওই ভবনে আগুন লাগে। সেখানে মূলত পুরনো প্লাস্টিক ও রাবার রাসায়নিকের সাহায্যে গলিয়ে স্যান্ডেল তৈরি করা হতো বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার খবর পেয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস পৌঁছে গেলেও গলিটি একেবারেই সরু হওয়ার কারণে ঘটনাস্থলে তাদের গাড়ি যেতে পারেনি। কয়েক শ মিটার দূরে গাড়ি রেখেই তারা মই নিয়ে ঘটনাস্থলে যান ও পাইপের সাহায্যে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। তবে আগুনের তীব্রতার তুলনায় তাদের ট্যাংকারের পানি সরবরাহ যথেষ্ট ছিল না। ঘটনাস্থলের আশপাশেও পানির মজুদ ছিল না। এসময় স্থানীয়রা বাসা-বাড়ির ট্যাংকি থেকে পানির যোগান দেওয়ার চেষ্টা করেন।
আধুনিক ল্যাডারবাহী গাড়ি প্রবেশের যথেষ্ট জায়গা না থাকায় সাধারণ ল্যাডারের সাহায্যেই আগুন নেভানোর কাজ করছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। প্রথমেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তারা। আগুনের তাপে তাদের সমস্যা হচ্ছিলো। এসময় অপরদিকের ভবন থেকে তাদের শরীরে পানি দেওয়া হয়। আর কারখানাটির গলে যাওয়া প্লাস্টিকের দুর্গন্ধের কারণেও তাদের সমস্যায় পড়তে হয়।
ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য জানান, জার্মানি থেকে আনা অত্যাধুনিক ল্যাডারবাহী গাড়ি তাদের রয়েছে, যা ২৪ তলা পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত বহু এলাকায় আগুন লাগলে সেই গাড়ি নিয়েই প্রবেশ করাই তাদের জন্য দুষ্কর হয়। ঘনবসতি ও সরু গলির কারণে যেকোনো দুর্ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়।
এর আগে গতকাল রাজধানীর ডেমরায় এক গুদামে আগুন লেগেছিল। সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা। রাতভর সেই আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। আশপাশে জলাধার না থাকায় একপর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসকে ড্রেনের পানি ব্যবহার করতে হয়েছে।
এদিকে ইসলামবাগের আগুনের সূত্রপাত প্রসঙ্গে স্থানীয়রা বলছেন, এটা একটা কারখানা, এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরোনো প্লাস্টিক ও অন্যান্য জিনিসপত্র এনে পুনপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। ভবনের সামনে বিদ্যুতের তার রয়েছে। এছাড়া রাসায়নিক থাকলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। চারপাশের প্রায় সব ভবনেই কারখানা ও বাসাবাড়ি মিশ্র অবস্থায় ব্যবহার করা হচ্ছে। আগুন ছড়ালে বড় ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছিলাম। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত তৎপরতায় আগুন ছড়ায়নি। ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভবনটির তিনদিক দিয়ে পানি দেয়।
ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা র্যাব-১০ লালবাগ ক্যাম্পের উপ-পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে আমরা ৪টা বাজার ১০ মিনিট আগেই ঘটনাস্থলে এসেছি। র্যাব ও পুলিশ মিলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করেছি।
পুলিশের উপ-পরিদর্শক জাকারিয়া বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লালবাগ থানা ও পার্শ্ববর্তী থানাগুলোর পুলিশ সদস্যরা এখানে এসেছেন। আমরা জানতে পেরেছি রমজান মাস হওয়ায় ওই কারখানাটি বন্ধ ছিল। কেউ ভেতরে ছিলেন বলে জানা যায়নি। আশা করছি কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না। আমাদের সকলের সমন্বয়ে আগুন প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সময়মতো এসে কাজ শুরু করেছিলেন এবং এলাকাবাসীও সহযোগিতা করেছেন। সবার সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
You must be logged in to post a comment.