চুয়াডাঙ্গার দীননাথপুরে কমলা দোয়ায় শতাধিক বস্তা সরকারি সার ব্যবহারের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৯:৩৩ পূর্বাহ্ন

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের দীননাথপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জলাশয় ‘কমলা দোয়া’তে মাছ চাষের নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি সার ব্যবহারের অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের বাধা ও অভিযোগের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে অবশিষ্ট প্রায় ৩০ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। তবে এর আগেই শতাধিক বস্তা সার জলাশয়ে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের কমলা দোয়ার প্রায় ৮০ বিঘা জলাশয় লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষ করে আসছেন শষ্টি মিয়া ও তার অংশীদার শাহাবুদ্দিন মিয়া।

অভিযোগ রয়েছে, গত শনিবার দুপুরে তাদের উপস্থিতিতে ১০ থেকে ১২ জন জেলে প্রায় ১৭০ বস্তা সার নিয়ে জলাশয়ে প্রবেশ করেন। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগেই প্রায় ১৪০ বস্তা সার পানিতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়।এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যখন সাধারণ কৃষকরা জমিতে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত সার সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন একটি জলাশয়ে এত বিপুল পরিমাণ সরকারি সার কীভাবে এলো এবং কোথা থেকে সরবরাহ করা হলো?

এ নিয়ে গ্রামজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সার প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না দিয়ে উল্টো স্থানীয়দের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ করেন।

এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত চুয়াডাঙ্গা জেলা ওলামা দলের দায়িত্বশীল নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (আনা মিয়া) দাবি করেন, বিষয়টি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অবগত রয়েছেন।

তবে পরে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এমন কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান। দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা সৃষ্টি হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঈদের ছুটিতে গ্রামে আসা ঢাকাস্থ শ্রমিক দল নেতা লিটন জানান, কমলা দোয়ায় বিপুল পরিমাণ সার দেখতে পেয়ে তিনি বিষয়টি জানতে চান। এ সময় তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে বিষয়টি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অবহিত করেন।

লিটন বলেন, “এটি শুধু বড় ধরনের অনিয়ম নয়, মাছের জলাশয়ে এভাবে বিপুল পরিমাণ সার প্রয়োগ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্র দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং অবশিষ্ট প্রায় ৩০ বস্তা সার জব্দ করেন। তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো মামলা বা মোবাইল কোর্ট পরিচালিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সার অবৈধভাবে মজুত ও ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে ৩০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। আগামীকাল (সোমবার) উপজেলা কৃষি অফিসে লিজগ্রহীতাদের তলব করা হয়েছে।

তদন্তে অবৈধভাবে সার ক্রয় ও জলাশয়ে প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মাসুদুর রহমান বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”ঘটনার পর থেকে কমলা দোয়াকে ঘিরে পুরো এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

সরকারি সার কীভাবে জলাশয়ে পৌঁছালো, এর পেছনে কোনো সিন্ডিকেট জড়িত কি না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা। সচেতন মহল দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি।

Facebook Comments
সংবাদটি শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

আরো সংবাদ