অন্যদৃষ্টি স্বাস্থ্যকথন।।
পুরুষেরা তাদের সব কিছুই নিয়ে বেশি উদাসীন থাকেন। দেহের যেকোনো সমস্যাকে সাধারণ সমস্যা মনে করে পাত্তাই দিতে চান না। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, এই সাধারণ সমস্যাগুলোই একদিন হয়ে যেতে পারে, মরণ ব্যধি ক্যান্সার। আবার অনেক সমস্য ক্যান্সার শরীরে বাসা বাঁধার পরে যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে তখন ছোট ছোট উপসর্গ দিয়ে সেটা জানান দেয়। তাই দেহের কোনো অর্থাৎ যেকোনো পরিবর্তনকে অবহেলা করলে চলবে না। আসুন তাহলে আজ জেনে নিন, আপনিও কি আছেন এমন ঝুঁকিতে।
অণ্ডকোষে পিণ্ড: ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো টেস্টিকল বা অণ্ডকোষে ব্যথাহীন একটি লাম্প বা পিণ্ড অনুভব করবেন আপনি।এক্ষেত্রে কোনো ধরণের ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা যায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আপনি বুঝতে পারেন না। তাই অণ্ডকোষে কোনো পিণ্ড তৈরি হয়েছে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে।
স্তনে ব্যথা: টেস্টিকুলার ক্যান্সারের কারণে পুরুষের স্তনে ব্যথা এমনকি তরল নিঃসরণ হতে পারে। কিন্তু কেন? অণ্ডকোষে টিউমার হলে সেখানে এক ধরণের প্রোটিন তৈরি হয় যা স্তনে এসব প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এ ঘটনায় বিব্রত না হয়ে অতিসত্বর তা ডাক্তারকে জানানো উচিত।
অণ্ডকোষের আকার পরিবর্তন ও অণ্ডথলিতে পানি আসা: অণ্ডকোষের তুলনায় অন্যটি ছোট বা বড় হওয়া, ফুলে যাওয়া বা একদিকে ঝুলে যাওয়া টেস্টিকুলার ক্যান্সারের উপসর্গ। এছাড়া অণ্ডথলি বা স্ক্রোটামে পানি আসা স্বাভাবিক, কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে এই অবস্থা বজায় থাকাটা নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক। টিউমার থাকলে এমনটা হতে পারে। এর পাশাপাশি অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তার দেখাতে দেরি করবেন না।
অণ্ডকোষ ভারী অনুভূত হওয়া: কোনো পিণ্ড না থাকলেও অনেক পুরুষের কাছে অণ্ডথলি বা স্ক্রোটাম ভারী অনুভূত হতে পারে, চাপা ব্যথাও হতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারকে জানান এ লক্ষণটি।
সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধি: টেস্টিকুলার ক্যান্সার শুধু বয়স্কদেরই নয়, বরং টিনেজার বা বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদেরও হতে পারে। অন্য কিশোরদের তুলনায় আগে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ যেমন স্বরভঙ্গ এবং গোঁফ-দাড়ি গজানোটা টেস্টিকুলার ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। এক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তার দেখানো উচিত।
পিঠে ব্যথা ও কাশি: ক্যান্সার যখন শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়ায়, একে বলা হয় মেটাস্ট্যাসাইজিং। এর একটি লক্ষণ হতে পারে পিঠে ব্যথা, কাশি এমনকি ঘাড়ে ফুলে থাকা পিণ্ড। শরীরের যে কোনো স্থানে পিণ্ড দেখা দিলেই তা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরী। কারণ এর অর্থ হতে পারে আপনার টেস্টিকুলার ক্যান্সার আছে এবং তা ছড়িয়ে পড়েছে।
তলপেটে ব্যথা: টেস্টিকুলার ক্যান্সার বেড়ে যাবার আরেকটি উপসর্গ হতে পারে তলপেতে ব্যথা। ফুলে যাওয়া লিম্ফ নোড এবং লিভারে এই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার কারণে পেটে ব্যথা হতে পারে।
যৌনাঙ্গে পরিবর্তন: নারীদের যেমন নিজেদের স্তনে পরিবর্তন দেখা গেলে স্তন ক্যান্সারের জন্য টেস্ট করাতে হয়, তেমনি পুরুষেরও যৌনাঙ্গ বিশেষ করে অন্ডকোষে কোনোরকম পরিবর্তন দেখা গেলে অতিসত্বর ডাক্তারকে জানাতে হবে। অণ্ডকোষের আকার আকৃতিতে পরিবর্তন, স্ফীতি, ওজনে ভারী হয়ে যাওয়া বা এতে কোনো পিন্ড স্রিস্তি হওয়া হতে পারে অণ্ডকোষের ক্যান্সারের লক্ষণ।
ত্বকে দৃশ্যমান পরিবর্তন: ত্বকের ক্যান্সারের দিকে বেশিরভাগ মানুষই লক্ষ্য করেন না। ত্বকে নতুন কোনো তিল, আঁচিল অথবা কালো দাগ ত্বকের ক্যান্সারের পুর্বাভাস দেয়। আপনি যদি দেখেন এগুলো আগের চাইতে আকারে বড় হচ্ছে বা ছড়িয়ে পরছে তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
মুত্রত্যাগে সমস্যা: অনেক দিন ধরে মুত্রত্যাগের সময়ে ব্যাথা, মুত্রের সাথে রক্ত যাওয়া, শুক্রাণুর সাথে রক্ত যাওয়া এগুলো হতে পারে প্রস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ।
মুখে ক্ষত অথবা ব্যাথা: মুখে ব্যাথা হলে তা ঠিক করা ডেন্টিস্টের কাজ। কিন্তু আপনি যদি দেখেন এমন কোনো ক্ষত বা ব্যাথা যা দীর্ঘদিন ধরে আছে, সারছে না কোনোভাবেই, তাহলে আপনি ডাক্তারকে জানাবেন অবশ্যই। যারা ধূমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নিঃসন্দেহেই বেশি।
মলের সাথে রক্ত: মলের সাথে রক্ত গেলে তা পাইলস বা এ ধরণের রোগ হতে পারে তা সত্যি। কিন্তু এটা কোলোন ক্যান্সারেরও লক্ষণ হতে পারে। আগে এটা বয়স্ক মানুষের মাঝে বেশি দেখা যেত কিন্তু এখন তা কম বয়সীদের মাঝেও দেখা যায় তাই সাবধান থাকা জরুরি।
পেটে ব্যাথা অথবা বমি ভাব: সাধারণ বদহজমের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো কিছুই নেই। কিন্তু ঘন ঘন পেট ব্যাথা, পেটের পেশিতে টান পড়া এবং সব সময় বমি বমি লাগাটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এটা হতে পারে লিউকেমিয়া অথবা ইসোফ্যাগাল, লিভার, প্যানক্রিয়াটিক অথবা কলোরেকটাল ক্যান্সারের লক্ষণ।
ঘন ঘন জ্বর বা ইনফেকশন: সাধারণত আপনার স্বাস্থ্য ভালোই। কিন্তু সম্প্রতি ঘন ঘন জ্বর হচ্ছে আপনার, ফ্লু-এর মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, ইনফেকশন হচ্ছে সহজে। তবে তা হতে পারে লিউকেমিয়ার লক্ষণ। কারন এটি শরীরের রগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দেয়।
ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া: গলা খুসখুস করা এবং ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া একদিকে যেমন গলা এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে, তেমনি হতে পারে লাং ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ের উপসর্গ।
শরীরে কালশিটে পড়া: ছোটখাটো ব্যাথা পেলেই সহজে ত্বকে কালশিটে পড়ে যাওয়া, এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের এখানে ওখানে অযথাই কালশিটে পড়াটা হতে পারে লিউকেমিয়ার আরেকটি লক্ষণ।
অপ্রত্যাশিত ওজন কমা: ওজন কমানোটাকে অনেকেই স্বাগত জানান। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত অনেকটা ওজন ঝরে জাওয়াটা মোটেই ভালো নয়। এটা বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
অকারণ ক্লান্তি: ক্লান্তি সবার মাঝেই দেখা যায়। বিশেষ করে সপ্তাহের শেষের দিনটা তো সবারই কাটে ঘুমে ঘুমে। কিন্তু মাসখানেক ধরে প্রতিদিনই ক্লান্ত লাগছে, অথবা সহজেই হাঁফ ধরে যাচ্ছে, তবে ডাক্তার দেখাতেই হবে। এটা হতেপারে লিম্ফোমা বা লিউকেমিয়ার লক্ষণ।
প্রচণ্ড মাথাব্যাথা: মাইগ্রেনের সমস্যা বা তেমন মাথাব্যাথা সমস্যা নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রচণ্ড মাথাব্যাথায় ভুগছেন কিছুদিন ধরেই, তবে তা ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ হতে পারে।
প্রস্রাবে পরিবর্তন: প্রস্রাবের প্রবাহে যে পরিবর্তনগুলো হতে পারে ক্যান্সারের লক্ষণ: প্রস্রাবের প্রবাহ শুরু করতে সমস্যা, প্রস্রাবের প্রবাহ বন্ধ করতে সমস্যা, স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল প্রস্রাবের স্রোত, প্রস্রাব ঝরা বা চুইয়ে পড়া, দিনে কতবার প্রস্রাব করা হচ্ছে সেই হার-এ পরিবর্তন, অণ্ডকোষের অথবা অন্ডকোষের ভেতরের মাংসপিণ্ডের আকার এর স্ফীতি বা সংকোচন, অণ্ডকোষের ওজন বেড়ে যাওয়া এবং লিঙ্গোত্থানে সমস্যা।
মুখের পরিবর্তন: মুখের ভেতরে এবং গলায় যেসব পরিবর্তন ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে: মুখের ভেতরে সাদা দাগ (গোল স্পট বা লম্বা দাগ), মুখে এবং গলায় অনবরত ব্যথা, খাবার গিলতে সমস্যা, নিচের চোয়াল নাড়াতে সমস্যা, অজানা কারণে দাঁত নড়বড়ে হওয়া বা উঠে আসা, মুখ ফুলে যাওয়া, ঠোঁটে অসাড়তা বা অতিসংবেদনশীলতা, গালের ভেতরে বা জিহ্বায় ক্ষত ও ঘাঁ অথবা জিহ্বা থেকে রক্ত পড়া, অনবরত কফ-কাশি বা স্বরভঙ্গ এবং কফের সঙ্গে রক্ত বের হওয়া।
স্তনে পরিবর্তন: পুরুষদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। যত স্তন ক্যান্সার হয় তার মাত্র ১% হয় পুরুষদের স্তনে। আর এ কারণেই পুরুষরা স্তন ক্যান্সারের লক্ষণগুলো অগ্রাহ্য করেন। পুরুষদের স্তন ক্যান্সার হয় মূলত ইস্ট্রোজেন হরমোনের উচ্চ মাত্রা, ক্ষতিকর বিকিরণ বা পারিবারিকভাবে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে।
পুরুষদের স্তন ক্যান্সারের লক্ষণগুলো হলো: স্তনের আকার বেড়ে যাওয়া, স্তনের বোটায় ব্যথা, স্তনবৃন্তের সংকোচন বা ওল্টানো অবস্থা, স্তনবৃন্তে ক্ষত, স্তনবৃন্তের চারপাশে গোলকার লালচে হওয়া বা মাংসপিণ্ড যাতে ব্যথা নাও থাকতে পারে, স্তনবৃন্ত থেকে তরল নিঃসরিত হওয়া যা দেখতে পানির মতো, কালো বা রক্তাভ হতে পারে, বাহুর নিচের লসিকাগ্রন্থি বেড়ে যাওয়া, স্তনবৃন্ত বা এর চারপাশে লাল হয়ে যাওয়া।
পাকস্থলি সংশ্লিষ্ট লক্ষণসমূহ: পাকস্থলিতে এবং পেটের ব্যথা হতে পারে নানা কারণে। কিন্তু ব্যথা কমানোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি তা না কমে তাহলে তা ক্যান্সারের লক্ষণও হতে পারে। পাকস্থলি সংশ্লিষ্ট ক্যান্সারের লক্ষণগুলো হলো: ক্ষুধামান্দ্য, দীর্ঘমেয়াদি এসিডিটি, বুক জ্বালাপোড়া (পাকস্থলি বা গলার ক্যান্সারের লক্ষণ), বমি- রক্তসহ বা ছাড়া, পেট ফোলা, বা পেটে তরল জমা হওয়া, পাকস্থলিতে ব্যথা যা হতে পারে ভেতরের দিকে চাপ প্রয়োগ করার অনুভূতিযুক্ত (অগ্নাশয় ক্যান্সার), পাকস্থলিতে খিচুনি এবং অস্বস্তি (লিভার ক্যান্সার), অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া, প্রস্রাব বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া (কিডনি বা মূত্রাশয় ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার)।
অজানা কারণে ওজন কমা: যারা সুস্বাস্থ্যের জন্য ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন তাদের হুট করেই ওজন কমাটা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই যদি ওজন কমে যায় তাহলে বিপদের লক্ষণ। অগ্নাশয়, পাকস্থলি বা ফুসফুসের ক্যান্সার হলে এমন হঠাৎ করেই ওজন কমে যেতে পারে। এছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থির অতিসক্রিয়তা, ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস বা যক্ষ্মা হলে হঠাৎ করেই ওজন কমে যেতে পারে।
অন্যদৃষ্টি/ এস.খাঁন
You must be logged in to post a comment.