চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলাকালীন আন্দোলনকারীদের ‘দুর্বৃত্ত’ সম্বোধন করে নিউজ প্রকাশ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ওয়াসিফ আল আবরার নামে এক সাংবাদিক মারধরের শিকার হয়েছেন।
সে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন এন্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও একটি অনলাইন পত্রিকার প্রতিনিধি। মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলে এই ঘটনা ঘটে।
আহত অবস্থায় সাংবাদিককে ইবি মেডিকেলে নেওয়া হয়। পরে হলের সামনে থেকে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করা হয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওয়াসিফ শাহ আজিজুর রহমান হলে অবৈধভাবে দীর্ঘদীন ধরে অবস্থান করছিলেন। সে এলাকায় থাকতে ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিল ও কলেজে থাকা অবস্থায় পাবনার বেড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিল। ক্যাম্পাসে আসার পরেও সাংবাদিকতার নামে ছাত্রলীগের বয়ান ছেড়েছে। জুলাই আন্দোলনেও তার ভূমিকা বেশ বিতর্কিত। ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার কারণে তাকে সাংবাদিকদের সংগঠন ইবি রিপোর্টার্স ইউনিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এসব বিষয়ে তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা হল প্রভোস্টের কাছে অভিযোগ করেন। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রভোস্ট তাকে হল থেকে নেমে যেতে বলেন। তবে একটি গ্রুপ তাকে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করতে উৎসাহ প্রদান করেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। যে কারণে হল থেকে স্থায়ীভাবে না গিয়ে অবৈধ সিটে মাঝে মাঝেই ওই হলে থাকতেন তিনি।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর তাকে একটি পক্ষ শেল্টার দিচ্ছে। প্রভোস্ট স্যার হল থেকে নামিয়ে দেওয়ার পরেও তাকে ওই পক্ষ আশ্বাস দেয় যে, স্যার নামিয়েছে তো কি হয়েছে আমরা তোকে দেখবো। এই পক্ষটি ছাত্রলীগের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে। যেটা ছাত্ররা মেনে নেয়নি এবং মঙ্গলবার রাতে আবরারের রুমে গিয়ে তাকে হল থেকে নেমে যেতে বলে। সে নেমে যাওয়ার সময় ওই পক্ষের কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হয় এবং সে কেন হল ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে। তখন তাদের মধ্যে হট্টগোল। এসময় ধস্তাধস্তিতে আহত হয়ে পড়লে ওয়াসিফকে ইবি মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আন্দোলনকারীদের দুর্বৃত্ত সম্বোধন ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। এছাড়া ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে ওয়াসিফের অংশ নেওয়ার বেশকিছু ছবি অনলাইনে ভাইরাল হয়। এ নিয়ে আন্দোলনকারীরা তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সংশয় পোষণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় অভিযোগ তোলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে সমন্বয়কদের একটি পক্ষের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন তিনি এবং ক্যাম্পাসে গাঁ ফুলিয়ে চলাফেরা করেন। সূত্র জানায়, আঁতাতকারী সহ-সমন্বয়করা হলেন নাহিদ হাসান, সাজ্জাত শেখ, ইসমাইল হোসেন রাহাত ও সায়েম আহমেদ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বলেন, সাংবাদিককে মারধর করা হয়নি। তাকে বলার পর চলে যাচ্ছিলো, কিন্ত তাকে শেল্টার দেওয়া গ্রুপের লোকজন সেখানে এসে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে। শেল্টার দেওয়া পক্ষের দাবি, আবরারকে মারধর করা হয়েছে এবং তারাও মারধরের শিকার হয়েছেন।
এদিকে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ ওয়াসিফ আল আবরারের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুললেও অন্য পক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এবং জুলাই আন্দোলনে সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে দাবি করেছেন। এদিকে ওই সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় ইবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

এ নিয়ে একইদিন দিবাগত রাত ২ টার দিকে আন্দোলনকারীদের ২টি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তা হাতাহাতির পর্যায়ে গড়ায়। এসময় ট্রেজারার ড. জাহাংগীর আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়পক্ষকে শান্ত করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে বিষয়টি সমাধানের জন্য বলেন। এরপর প্রক্টর অফিসে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ওয়াসিফ আল আবরারের ভাষ্য, সে রুমে অবস্থান করছিলো। তখন কয়েকজন গিয়ে ‘তুই ছাত্রলীগ করতি, আন্দোলনকারীদের দুর্বৃত্ত বলেছিস, ছাত্রলীগের সাথে তোর ছবি আছে’ এসব বলে তাকে হল থেকে নেমে যেতে বলে। সে বিষয়গুলো অস্বীকার করলে বলে তাদের কাছে এটার প্রমাণ আছে। তখন সে আন্দোলনের সময় আন্দোলনের নিউজ কভারেজ করেছি বলেল তাকে বলে তুই হলুদ সাংবাদিক। তারা রুমের লাইট বন্ধ করে কিলঘুষি দেয় বলে দাবি করেন ওয়াসিফ।
এই বিষয়ে সহ-সমন্বয়ক নাহিদ হাসান বলেন, ওয়াসিফ আল আবরারকে হল থেকে নামা না নামানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহ আজিজুর রহমান হলে একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন আমি ও আমার সহযোদ্ধারা সেখান যাই। পরে আবরারকে ইবি মেডিকেলে পাঠানো হয়। এসময় আমাকে হেনস্তা করা হলে আমরা ভিসি বাসভবনের সামনে অবস্থান নেই। এসময় আরও একটি পক্ষ সেখানে যাওয়ার পর বিরূপ মন্তব্য করা হলে হাতাহাতি ও বাকবিতন্ডা হয়। পরে প্রক্টরিয়াল বডি আশ্বস্ত করলে আমরা সেখান থেকে প্রক্টরিয়াল অফিসে বসে আলোচনা করি। আমি আশাবাদি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার হবে।
সহ-সমন্বয়ক তানভির মন্ডল বলেন, তৃতীয় পক্ষ ঢুকে এরকম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেছে। আমরা এই ঘটনার তদন্ত পূর্বক সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল শিক্ষার্থীদেরকে ধৈর্য্য ধারণ করে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. পারভেজ হাসান বলেন, তার তেমন গুরুতর কিছু হয় নি। আমরা ধারণা করছি তার শ্বাসনালীতে আঘাত লেগেছে। প্রথমে সে সুস্থই হয়ে গেছিল। পরে শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল এবং বমি করছিল। এসময় রোগীর সঙ্গে কথা বলে এবং বাইরে থেকে আবার তার উপর আক্রমণ হতে পারে এমন কথা শুনেছিলাম। এজন্য তার নিরাপত্তারকথাসহ যাবতীয় বিষয় চিন্তা করে তাকে কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়।
হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ.টি.এম মিজানুর রহমানের ভাষ্য, হলে ছেলেটার এটাচমেন্ট না থাকায় তাকে হল থেকে চলে যেতে বলা হয়। তার রুমমেটকেও বলা হয়েছে আবরার যেন রুমে এসে না থাকে, যেহেতু তার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। এরপরেও আমার কথা অমান্য করে সে হলে এসে থাকছে। অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরকে উসকে দিচ্ছে। এতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গতরাতে যারা ওকে নামিয়ে দেয়ার জন্য গিয়েছিল তারাও আমার সঙ্গে কথা বলে যায়নি। এটা তো হল প্রশাসনের দায়িত্ব। দুই পক্ষকেই আমি মেনে নিতে পারছি না।
এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরে আমরা উভয়পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভিসি অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, আমি প্রক্টরকে বলেছি, এ বিষয়ে প্রক্টর যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
You must be logged in to post a comment.