১৮ অগাস্ট ২০১৮ || শনিবার || ০৪:০৯ অপরাহ্ন

বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে টানাহেঁচড়া।

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।

দেশের বিশৃঙ্খল শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সুযোগ সন্ধানীরা ওৎ পেতেছে, চলছে টানাহেঁচড়া। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের গুরুত্ব অনুধাবন করে যখন দেশের সকল শ্রেনী পেশার মানুষ জাগ্রত হচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি তুলেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ পুনরায় ম‍্যানেজিং কমিটির হাতে দেয়ার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন স্থায়ী কমিটি। এই সুপারিশ অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকার শিক্ষাব্যবস্থার বিরাজমান বিশৃঙ্খলা রোধে নতুন নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে চলেছে। কিন্তু প্রত‍্যন্ত অঞ্চলের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা মানা হচ্ছে না। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিরাজমান সংকট নিরসনে জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকাই অধিক যুক্তিযুক্ত। ম‍্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের নামে অবৈধ অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে অযোগ্য অদক্ষ লোকজনদের নিয়োগ দেয়া হয়। এমনি অবস্থায় এনটিআরসি’র নিকট থেকে নিয়োগ ম‍্যানেজিং কমিটির হাতে দেয়ার সুপারিশ, মামা বাড়ির আবদার, বলেই প্রতীয়মান হয়। শিক্ষার মানোন্নয়নে সকল ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে হবে। মাননীয় সংসদ সদস্যদের এই অন‍্যায় আব্দার মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। বরঞ্চ সংসদ সদস্যরাই সুপারিশ করা উচিত ছিল যে, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতিমুক্ত রেখে জাতীয়করণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সরকারের অধীনে রাখা। আমাদের মনে রাখা উচিত নিয়োগকৃত এই শিক্ষকরাই আগামী প্রজন্মকে মানসম্মত শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করবে। অন্তর্নিহিত বক্তব্য হলো, নিম্ন মানের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে উচ্চ মানের শিক্ষার প্রত‍্যাশা করা নির্বুদ্ধিতার সামিল।

জনপ্রতিনিধিদের কাছে নিয়োগের কর্তৃত্ব ফেরত গেলে, মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ পাবে না, এটা নিশ্চিত। এমনিতেই আমারা মানসম্মত যোগ‍্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারছি না, বিদেশ থেকে কর্মী আমদানি করতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ পূণরায় জনপ্রতিনিধিদের হাতে দেওয়া হলে, শিক্ষার মানের আরও অবনতি ঘটবে। গুনগত শিক্ষক ব‍্যতিত গুনগত শিক্ষার চিন্তাও করা যায় না। ম‍্যানজিং কমিটির নিকট শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, দুর্নীতি বাড়বে এটা নিশ্চিত। ইতোমধ্যেই জনপ্রতিনিধিদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশাল অঙ্কের নিম্ন মানের শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগকৃত শিক্ষকদের পেশাগত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ সরকারকে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারিভাবে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা জরুরি।

সংসদ সদস্যরা এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের চেষ্টা করছেন, এটা দুঃখজনক। যেখানে এনটিআরসিএ’র সফলতার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষক নিয়োগেও উদ্যোগ নিয়েছে। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন ডিসিরাও। এরইমধ্যে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিসিরা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমেছে। কিন্তু একটি ভালো উদ্যোগকে সমর্থন না দিয়ে, জনপ্রশাসন সংসদীয়স্থায়ী কমিটি ম‍্যানেজিং কমিটির নিকট শিক্ষক নিয়োগ ফেরত দেয়ার সুপারিশ অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত।
তবে সকল সংসদ সদস্যরাই এমন অযৌক্তিক দাবি করেছেন এমনটা বিশ্বাস করি না।

আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। এই কমিশন শিক্ষানীতির আওতাধীন ও এমপিওভুক্ত সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, পদোন্নতি এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও নিয়োগকৃত শিক্ষকদের মানোন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করবে।
শিক্ষানীতিতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক সহায়তা প্রাপ্ত বেসরকারি  মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজের জন্য মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষক নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারি কর্মকমিশনের আদলে একটি বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। কাজীর গরু কাগজে আছে, গোয়ালে নেই।

জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়নে মন্থরগতি কারণেই বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষামন্ত্রণালয় খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপন ও খসড়া শিক্ষা আইন প্রণয়নের নামে তালবাহানা করে ৮ বছর অতিক্রান্ত করেছে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চরম অবহেলা উদাসীনতা, অদুরদর্শিতা ও দুর্নীতির কারণে উল্লেখযোগ্য তেমন অগ্রগতি হয়নি।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির আপত্তির কারণেই নাকি শিক্ষক নিয়োগে পৃথক কর্মকমিশন গঠনের উদ্যোগ নিতে পারছেনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই কমিশন গঠন হলে নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে এমন আশঙ্কা বিসিএস শিক্ষা সমিতির। উল্লেখিত বক্তব্য বিবৃতি বিভ্রান্তি মূলক ও হাস‍্যকর। বিসিএস শিক্ষা সমিতি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় বিরোধিতা করেনি কেন? জাতীয় সামষ্টিক বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার চেয়ে কখনোই কোন ক্ষুদ্র অংশের স্বার্থ বড় হতে পারে না। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায়, জাতীয় স্বার্থ বিনষ্ট করা হবে, এটা কোন গ্রহনযোগ্য যুক্তি হতে পারে না। কিছু দিন পর হয়তোবা শুনব, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় ম‍্যানজিং কমিটির নিকট দেয়া হলো।
আমরা বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরামের পক্ষ থেকে জাতীয় শিক্ষানীতির দ্রুত বাস্তবায়নের জোরালো  দাবি জানাচ্ছি।

দেশের ৯৭% শিক্ষা দায়িত্ব পালন করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি রেখে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে, আর একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা ভোগ করছে। এখান থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় “বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ, করা।

সভাপতি

বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম

ঢাকা বাংলাদেশ।

Facebook Comments


© All rights reserved © 2017 Onnodristy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com