বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত অস্ট্রেলিয়ান এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের একটি ভিডিও ইনবক্সে পাঠিয়ে একজন জানতে চাইলো, এই ভিডিওর বিষয়ে আমার মন্তব্য কী? মূলত ওই ভিডিওতে তিনি বলেছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে আসন ভাগাভাগির নির্বাচন। এতে এনসিপি ৮, জামায়াত, ৭০-৮০ এবং বাকী আসনগুলো বিএনপি নিয়ে সরকার গঠন করবে। এছাড়াও আরও কিছু প্রেডিকশন ছিল। তবে অনেকে অবাক হয়েছেন কারণ, তিনি নির্বাচনের অন্তত তিন মাস আগে এই বিশ্লেষণ দিয়েছিলেন।
যায় হোক, নির্বাচনের দিন আমি আমার প্রথম লেখায় একই ক্লেইম করেছি। আমি বলেছি, এটি খুবই হাই-লেভেলের নেগোসিয়েশনে হয়েছে। এর সঙ্গে প্রভাবশালী সব দল জড়িত। এছাড়া আরও অনেক পক্ষই জড়িত।
নেগোসিয়েশন যে হয়েছে তার আরও একটা সূক্ষ্ণ প্রমাণ হলো- ভোট সুষ্ঠু হওয়া। ভোট সুষ্ঠু দেখিয়ে, ফলাফল ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। এজন্যই সেই লেখায় আমি এই সংঘাত-প্রাণহানিবিহীন ইঞ্জিনিয়ারিংকে স্বাগত জানিয়েছিলাম।
গণভোট সম্পর্কে বলেছিলাম, এটিও সঠিক ফলাফল নয়। এটি প্রফেসর ইউনূসের চেয়ে নেওয়া। কারণ, এই জুলাই সনদ ছাড়া জনগণকে দেখানোর মত তার আর কিছু নেই।
আমি ওই লেখায় আরও বলেছিলাম, জামায়াত আমিরসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা পাশ করেননি। কিন্তু তাদের পাশ দেখানো হয়েছে। এতে একাধিক পার্টিপ্রধানও আছে। কারণ, এই হেভিওয়েটরা সংসদে থাকা মানে পার্লামেন্টের ওজন বাড়া। এতে ক্রেডিবিলিটি বাড়বে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই নেগসিয়েশন? আর দলগুলোই বা কেন মেনে নিল? রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্যই তো থাকে সরকার গঠন করা। তাহলে এত বড় ভ্যাকুয়াম পেয়েও কেন আসন সমঝোতায় রাজি হলো। এর কারণ হলো- দেশটাকে একটু স্থিতিশীল করা। ভঙ্গুরতা থেকে পুনর্গঠন করা। ব্যর্থ রাষ্ট্রের যাত্রা থেকে বাঁচানো। আর এই শর্তেই হাসিনাবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া দলগুলোর এই একাত্মতা।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এত কম আসন এনসিপি মেনে নিল? আর জামায়াতই কেন এত বড় সুযোগ পেয়ে সরকারে যাওয়ার চান্স নিল না? উত্তর হচ্ছে- প্রত্যেক দলই তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে জানে। বিশেষ করে দলের হাইকমান্ড।
আমি আগের লেখায় বলেছি, এনসিপির জন্য আটটা আসন মোর দ্যান এনাফ। যদিও সারজিস আর পাটওয়ারীকে তারা বের করতে পারেনি বলে এই সংখ্যা ছয়ে নেমে এসেছে। এটাও এনাফ ওদের জন্য। আর এর মধ্যদিয়ে দলটা টিকে গেল।
অন্যদিকে জামায়াত নেতারা বেশ কৌশলী। ওরা বুঝেছে ভিন্ন জিনিস। ওরা ভেবেছে, দেড় দশকে দেশের কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, অর্থনীতি ফোকলা হয়ে গেছে। জনমনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকে তৈরি হয়েছে নানা আকাঙ্খা। এই অবস্থায় পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিশ্চিতভাবেই নির্বাচিত সরকারের হাতে যাবে। তারা প্রত্যাশা পূরণে কোনোভাবে ব্যর্থ হলে জনপ্রিয়তা হারাবে। জামায়াত এই মুহূর্তে কেইপেবল না। আর বলাবাহুল্য, যে সরকারই আসুক এই প্রত্যাশা পূরণ করে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ কাজ হবে না। ফলে তাদের জনপ্রিয়তা কমবে।
জামায়াত বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তাদের এই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এটি তারা এভাবে হারাতে চাচ্ছে না। যদিও এই ডিসিশন নেওয়া দলটির জন্য কঠিনই ছিল।
তারপরও দলটি যেহেতু আদর্শিক ক্যাডারভিত্তিক; ফলে ক্ষমতা নিয়ে ট্রাডিশনাল দলগুলোর মতো তাদের তাড়াহুড়ো নাই। বরং জাপানি স্টাইলে ‘গাছ লাগিয়ে যাবে বাবা; ফল খাবে সন্তান আর নাতি-নাতনীরা’ এই থিওরিতে ওরা বিশ্বাসী। ফলে জামায়াত ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্নে এবার বেশি রিজিট হয়নি। যদি রিজিট হতো তাহলে নেগোসিয়েশন হতো না। আর নির্বাচন সংঘাতপূর্ণ হতো। ফল ভাগাভাগির এটাও একটা ডট।
এর চাইতে আরও ডিপার থিঙ হলো- জামায়াত মনে করেছে তারা যেহেতু সুশৃঙ্খল পার্টি; ফলে প্রতিকূল পরিবেশে যেমন সারভাইভ করতে পারে, তেমনি সামান্য অনুকূল আবহাওয়া পেলে দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। এর প্রমাণ- গত দেড় বছর।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দলটি হামলা-মামলার বাইরে থাকায় দ্রুত গতিতে দল সম্প্রসারণ করে ফেলেছে। বিপরীতে বিএনপি কিছুটা সংকুচিত হয়েছে, ভোটারদের আস্থা খুইয়েছে।
খেয়াল করেন, হাসিনার পতনের তিন মাসের মাথায় যদি নির্বাচন হতো তাহলে ভোটের রেজাল্ট কী হতো? বিএনপি পাইতো ২৮০, জামায়াত খুব বেশি হলে ৮-১০টি। অথচ বাধাহীন পরিবেশ পেয়ে মাত্র দেড় বছরে বাকি আসনগুলো গেইন করেছে। এজন্যই প্রথম থেকেই জামায়াত চাইতো, অন্তর্ভুক্তি সরকারের মেয়াদ দীর্ঘ হোক। ফলে তারা নির্বাচন চাইতো না।
অন্যদিকে বিষয়টি টের পেয়ে বিপুল জনপ্রিয় বিএনপি নির্বাচনমুখী হয়ে গেল। এবং সরকারকে চাপ দিল। রাজনৈতিক দলগুলোকে যেহেতু নির্বাচনমুখী হতে হয়; তাই বাধ্য হয়ে জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিল। তবে ভেতরে ভেতরে ওরা চেয়েছিল আরো দেরিতে নির্বাচন হোক। বিএনপির জনপ্রিয়তা কমুক, মানুষ জামায়াতমুখী হোক। তারপরও দেড় বছরের অর্জন জামায়াতের জন্য একেবারে কম নয়।
বিপরীতে বামদগুলোর দিকে তাকান। ওরাও আদর্শিক ফোর্স। কিন্তু ছোট হতে হতে এখন বিলিনের পথে। জামানত হারানোর বৃত্ত থেকে দলগুলো বের হতেই পারল না। এতদিন আওয়ামী লীগের অনুকম্পায় রাজনীতি করা বাম শক্তিগুলো পতিত আওয়ামী লীগের ভোটগুলোও পেল না। এখন আবার বিএনপির আনুকূল্য চাইছে।
এখানেই অন্য দলের সঙ্গে জামায়াতের সামর্থ্যের পার্থক্য। ফলে এটি জেনেবুঝেই জামায়াত এবার ক্ষমতার দৌড়ে অংশ নেয়নি, নেগোসিয়েশন করেছে।
তাহলে জামায়াত ক্ষমতায় যাচ্ছে কবে?
এই প্রশ্নের উত্তরে টাইমফ্রেম বেধে দেওয়া কঠিন, কিন্তু তারা যে যাবে এটা অনুমেয়। কারণ, দলটি অপেক্ষা করছে এমন সময়ের জন্য, যখন তাদেরকে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সাধা হবে। এরপর তারা ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশ পরিচালনা করবে। তাদের বাড়তি বৈধতা হবে ওই গানের কথাগুলোর মতো- ‘নৌকা ধানের শীষ নাঙল দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ’।
মানে মাঠ ফাঁকা করে নিচ্ছে। পরে একাই খেলবে তাই। যদিও এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য খুবই ক্ষতিকর।
জামায়াতের এবারের নির্বাচনে যে আসনপ্রাপ্তি এবং মোট ভোটপ্রাপ্তির যে হিসাব; তা অন্য দলগুলোর জন্য এলার্মিং। ভোটের হিসাবে দলটি বিএনপির ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে।
যে জনপ্রিয়তা তারা এবার অর্জন করেছে; এটি আর কমার চান্স কম বরং বাড়বে। কারণ, সরকারী দলের জনপ্রিয়তা কমে, আস্থা বিল্ড হয় বিরোধী দলের ওপর।
ফলে তারেক রহমানের দল টপ থেকে বটম আর শফিকুর রহমানের দল বটম থেকে আপে যাত্রা শুরু হচ্ছে এই সংসদ থেকেই।
তৃতীয় বিশ্বের দেশে যা ঘটে থাকে; অর্থাৎ একসময় জনগণের পূর্বঅভিজ্ঞতা এত বাজে হয়ে থাকবে যে- জামায়াতকে গ্রহণ করতে তাদের দুইবার ভাবতে ইচ্ছে করবে না। ওদের সামান্য ভালো কাজও খুব ভালো মনে হবে। জামায়াত এই দুর্বলতারই সুযোগ নেবে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা বিষয় ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গেছে যে, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের যে অবস্থান; সেটি নিয়ে ভোটারদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ভোটার প্রায় বিএনপি সমান ভোট দিয়ে জামায়াতকে সেই সিগনাল দিয়েছে। যদিও, বাম শক্তিগুলো জামায়াতের বিরুদ্ধে সেই বয়ান পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে জনগণ খুব বেশি কনভিন্স হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, বামদেরও একটা বড় অংশ জামায়াত।
গত দেড় দশক আওয়ামী লীগ জামায়াতকে ভয়াবহ কোনঠাসা করে রেখেছিল। মামলা-হামলা, গুম-খুন করে তাদের দমন করতে পেরেছিল। কারণ সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল না। প্রশাসনিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ ছিল না।
কিন্তু বিএনপি এখন চাইলেও সেটি করতে পারবে না। কারণ, সংসদের দলটির জোটসহ একটা বড় অংশগ্রহণ থেকে গেল। উচ্চকক্ষ গঠন হলে সেখানেও জামায়াত এলাই শক্তিশালী থাকবে। এই সুযোগে তারা দলীয় শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে; যা ভোটের রাজনীতিতেও কাজে আসবে।
সরকারে সফল হতে চাইলে বিএনপির করণীয় কী?
বিএনপির সামনে শত চ্যালেঞ্জ। সবই মোকাবিলা করা পসিবল যদি ঘরের মানুষ সাপোর্ট দেয়। বিএনপির সফল হওয়ার পেছনে বড় বাধা খোদ তার বেপরোয়া নেতাকর্মী। এরা যদি গণমুখী রাজনীতি না করে, পুরনো ধারার মধ্যেই ঘুরপাক খায়; তাহলে জনপ্রিয়তা কমতে বড়জোর একবছর লাগবে। আর দুই বছরের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। এটি ইন্টেরিম সরকারের সাথেও ঘটেছিল। ফলে, সচ্ছতা, জবাবদিহিতাই বিএনপির জন্য একমাত্র সরলপথ।
বিএনপিকে যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রকম শিথীলতা প্রদর্শন করা যাবে না।
আর এজন্য দল ও সরকারপ্রধান তারেক রহমানের জন্য একটি ভালো সার্কেল লাগবে; যারা তাকে পজিটিভলি গাইড করবে।
সাংবাদিকদের থেকে তৈলমর্দন প্রত্যাশা না করে গঠনমূলক সমালোচনা নিতে হবে। সাংবাদিকদের তৈল ভালো তৈল নয়। এটা শেখ হাসিনা থেকে শিখতে হবে।
জানি, কাজটি কঠিন কিন্তু এটিই তার জন্য সবচেয়ে তেতো উপকারী বটিকা।
সবশেষ পরামর্শ হলো, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ যা যা করেছিল; তার উল্টো কাজ করলেই তারেক রহমান সফল হবেন।
শুরুর শেষটায় আবার আসি, অস্ট্রেলিয়ান সেই কনটেন্ট ক্রিয়েটর যা যা বলেছেন, তা আমরা বুদ্ধিজীবীরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু কেউ সেটি বলবে না। এই না বলার কারণ হলো, পেট বাঁচানোর কায়দা।
তারা এটি বললে মানি অর্ডার বন্ধ হয়ে যাবে। এটাকে বলে, বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। আর যারা এই ভাগবাটোয়ারা সম্পর্কে জানেই না, ধরে নেবেন তারা আসলে বুদ্ধিজীবীই না। ফলে চোখ বন্ধ করে ওদের আনফলো করে দিতে পারেন।
লেখক: সাংবাদিক। অনি আতিকুর রহমান
You must be logged in to post a comment.