নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
২০ জানুয়ারী ২০২২, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন

সাধারণ মানুষের মধ্যে বঙ্গবন্ধু কতটা জনপ্রিয় ছিলেন?

ক্যাপ্টেন আলমগীর ছাত্তার
শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১, ১১:১১ পূর্বাহ্ন

আ মি লেখালেখি খুব কমই করি। যা লিখি তাও গ্রন্থাকারে। তবু ইত্তেফাক পত্রিকার ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু লেখার প্রচেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলাম না। এর কারণ, এই গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাটির আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে অবদান নেহাত কম নয়।

ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হলেন শ্রদ্ধেয় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানি হলেও পত্রিকাটির পরিচালনার সব দায়-দায়িত্ব ছিল মানিক মিয়ার। তিনি ঐ পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে রাজনৈতিক মঞ্চ নাম দিয়ে একটি সম্পাদকীয় লিখতেন। পত্রপত্রিকায় অমন ক্ষুরধার লেখনী বাংলার মানুষ আগে বা পরে কোনো দিন পড়েনি। ভবিষ্যতেও যে পড়বে তেমনটা আশা করা যায় না।

মানিক মিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা এবং সম্মান করতেন। মানিক মিয়াও বঙ্গবন্ধুর মতামতকে খুব গুরুত্ব দিতেন।

যা হোক, এসব কথা মনে করে ইত্তেফাকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু লেখার সুযোগ লাভ করাকে আমি যথেষ্ট সম্মানের ব্যাপার বলে মনে করি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কনফারেন্স এবং অনুষ্ঠানে যেখানেই বঙ্গবন্ধু যোগদান করেছিলেন সেখানেই তিনি হতেন সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষরা তাকে নিয়ে যেসব প্রশংসামূলক বাক্য উচ্চারণ করেছেন, এখানে সে সবের উদ্ধৃতি দেওয়ার মনে হয় প্রয়োজন নেই। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডন, দিল্লি হয়ে দেশে আসেন। করাচি থেকে লন্ডন পৌঁছে এরোপ্লেন থেকে নেমে বঙ্গবন্ধু যখন গাড়িতে ওঠেন, তখন অপেক্ষমাণ গাড়ির দরজা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোওয়ার্ড হিথ নিজের হাতে খুলে দিয়েছিলেন। যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সকল প্রটোকল ভেঙে আপনি নিজের হাতে কেন গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিলেন? ঐ সময় তিনি যে উত্তর দিয়েছিরেন, সে কথাও এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে বিশ্বের সাধারণ মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু কতটা পরিচিত এবং জনপ্রিয় ছিলেন, সে বিষয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি।

দুই.

১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাস। বাংলাদেশ বিমানের পাইলট আমার সতীর্থ ক্যাপ্টেন মনোয়ার এবং আমি নিউইয়র্ক যাই বোয়িং-৭০৭ এরোপ্লেনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে। আমরা ঢাকা থেকে লন্ডন পর্যন্ত গিয়েছিলাম বাংলাদেশ বিমানে। লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক গিয়েছিলাম প্যান অ্যামেরিকান এয়ারলাইন্সে।

ঢাকা থেকে লন্ডন পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং-৭০৭ এরোপ্লেন একটানা ফ্লাই করে লন্ডন যেতে পারত না। মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইন বিমানবন্দরে টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং অর্থাত্ জ্বালানি তেল গ্রহণের জন্য অবতরণ করতে হতো। একঘণ্টা যাত্রা বিরতির পর বিমানের এরোপ্লেন লন্ডনের উদ্দেশ্যে টেক অফ করত।

 

টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং হলেও যাত্রীদের টারমিনাল বিল্ডিং-এ এবং বিল্ডিংয়ের ডিউটিশপে যেতে বাধা ছিল না। ঐ একঘণ্টা যাত্রা বিরতির সময় আমি বাহরাইন বিমানবন্দরের টারমিনাল বিল্ডিংয়ের ডিউটিশটে গেলাম। ওখানে গিয়ে দেখলাম ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের বেশ সুদর্শন একজন পাকিস্তানি ভদ্রলোক ডিউটিশপের কাছে দুই বোতল হুইস্কি ক্রয় করে দাঁড়িয়ে আছেন।

ভদ্রলোককে দেখে অনেকটা পরিচিত মনে হলো। আমি ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পিআইএ-র পাইলট ছিলাম। অনেক বছর করাচি-লাহোর-রাওয়ালপিন্ডি কাটিয়েছি। তাই ভদ্রলোককে পিআইএতে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা হবেন বলে মনে করলাম। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে সুদর্শন ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করলাম। তাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, আপনি কি পিআইএতে কর্মরত আছেন? আপনাকে দেখে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে।

উত্তরে তিনি বললেন, না আমি পিআইএতে চাকরি করি না। আমি পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের অভিনেতা—কামাল। হয়তো আপনি আমার অভিনীত কোনো সিনেমা দেখেছেন। তাই আমাকে আপনার কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে। বললাম, হয়তো তাই হবে।

প্রসঙ্গ পালটিয়ে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, শেখ মুজিব আপনাদের একটা স্বাধীন দেশ দিয়েছেন। আর আপনারা কি করলেন। তাকেসহ তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করলেন। আমরা পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবকে হত্যা করিনি। এরপরেও আপনারা বলেন, আমরা পাকিস্তানিরা নিষ্ঠুর। আমি আপনাকে প্রশ্ন করছি, আমরা না আপনারা বেশি নিষ্ঠুর?

অভিনেতা কামালের প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারিনি।

পিআইএতে আমার সমসাময়িক একজন সিন্ধি পাইলট ছিলেন। তার নাম ছিল ক্যাপ্টেন ওয়াজেদ। কয়েক বছর আগে দুবাই বিমানবন্দরের একটি রেস্তোরাঁয় একই টেবিলে একজন পাকিস্তানি ভদ্রলোকের সঙ্গে বসে খাবার খাচ্ছিলাম। একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হলাম। জানতে পারলাম, ভদ্রলোক আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন ওয়াজেদের মেয়েকে বিয়ে করেছেন। তিনি বললেন, তার শ্বশুর প্রায়ই বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে ছয় দফার দাবি করেছিলেন তা শুধু তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। প্রযোজ্য ছিল সমগ্র পাকিস্তানের সবগুলো প্রদেশের জন্য। সেই ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের অন্যান্য প্রদেশগুলোর মানুষরাও লাভবান হতেন।

পূর্ব পাকিস্তান তো আজ একটি স্বাধীন দেশ। বর্তমান পাকিস্তান বলতে তো পাঞ্জাবকেই বুঝতে হবে। পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশগুলো তো বড়ই অবহেলিত। সিন্ধু-বেলুচিস্তানের সঙ্গে পাঞ্জাবের বৈষম্য সর্বক্ষেত্রে বড় বেশি দৃষ্টিকটু। এক সময় পাকিস্তানের অবহেলিত প্রদেশগুলোর মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। পাঞ্জাবের এই একাধিপত্য মেনে নিবে না। তখন পাকিস্তানের কি হবে, তা কে বলবে। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরেও পাকিস্তানের জন্য ছয় দফার দাবি সমানভাবে প্রযোজ্য।

বন্ধুবর ক্যাপ্টেন ওয়াজেদের মেয়ের জামাইর প্রতি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

তিন.

নিউইয়র্ক পৌঁছে ক্যাপ্টেন মনোয়ার এবং আমি জামাইকার হিলটন হোটেলে উঠলাম। হোটেলে থেকে নিত্যদিন হোটেলের কোচ সার্ভিসে প্যান অ্যাম ট্রেনিং সেন্টারে সিমুলেটরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে যেতাম। আমাদের বোয়িং-৭০৭-এর ট্রেনিংয়ের জন্য এক মাস নিউইয়র্কে থাকতে হবে।

একদিন সকাল বেলা ট্রেনিং সেন্টারে যাব বলে হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। হোটেলের কোচ বা বাস ছাড়তে তখনো পাঁচ মিনিট দেরি ছিল। কোচের ড্রাইভার একজন আফ্রো অ্যামেরিকান ভদ্রলোক আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। তার সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি যখন জানলেন, আমি বাংলাদেশের লোক, তখন তিনি বললেন, ‘ইউ বাস্টার্ডস কিলড শেখ মুজিব’। আফ্রো অ্যামেরিকান ভদ্রলোক সমস্ত বাঙালি জাতিকে বেজন্মা বলে গালি দিলেও তার প্রতি আমার মনে বিদ্বেষভাব সৃষ্টি হয়নি। তার প্রতি আমার একপ্রকার সম্মান বোধই জাগরুক হয়েছিল।

ক্যাপ্টেন মনোয়ার এবং আমি হোটেলেই খাওয়া-দাওয়া করছিলাম। বিদেশি ঐসব খাবার খেতে একদম ইচ্ছা করত না। নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ভবনের ক্যাফেটেরিয়াতে বাংলাদেশি খাবার পাওয়া যেত। যেমন ডাল-ভাত-সবজি ইত্যাদি। একদিন ক্যাপ্টেন মনোয়ার এবং আমি বাঙালি খাবার খেতে জে এফ কে বিমানবন্দরে গেলাম। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ক্যাফেটেরিয়াতে যে ডাল রান্না হতো, তা খুব ঘন। বাঙালিদের মতো তারা ঐ ডালকে বলে তড়কা ডাল।

তড়কা ডাল এবং সবজি দিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজনপর্ব সমাধা করে একটি ট্যাক্সি ধরে হোটেলে ফিরছিলাম। বিমানবন্দর থেকে কতটা দূর আসার পর গাড়ির ড্রাইভার ‘ইচিক দানা, বিচিক দানা/দানার ওপর দানা’ হিন্দি গানটা গাইতে শুরু করলেন। সাহেব মানুষ। এমন সুন্দর করে হিন্দি গান গাইছেন। আমরা বেশ একটু অবাক হয়ে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ গান তিনি কোথায় শিখেছেন। তিনি আমাদের বললেন, তিনি ইহুদী ধর্মাবলম্বী। তার জন্ম হয়েছিল ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিব শহরে। ওখানের স্কুল কলেজে তিনি পড়াশোনা করেছেন।

তেলআবিব শহরের সিনেমা হলগুলোতে অনেক ভারতীয় হিন্দি সিনেমা দেখানো হয়। ইসরাইলে থাকার সময় তিনি অনেক ভারতীয় সিনেমা দেখেছেন। ঐ সময় তিনি কিছু হিন্দি গান শিখেছিলেন।

ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিলেন সাহেব মানুষ। তিনি আমাদের ভারতীয় মনে করে ‘ইচিক দানা বিচিক দানা’ গান গাইতে শুরু করেন। তারপর একসময় জানতে চাইলেন, আমরা ভারতীয় কি-না?

বললাম, আমরা ভারতীয় না। আমরা বাংলাদেশের লোক। আমরা বাংলাদেশি জানতে পেরে ট্যাক্সি ড্রাইভারও সেই হোটেলের বাস ড্রাইভারের মতো করেই বললেন, ‘ইউ কিলড মুজিব। আই ডোন্ট টক উইদ ইউ’।

সারাটা পথ ট্যাক্সি ড্রাইভার আর একটি কথাও বললেন না। হোটেলে পৌঁছে মিটার দেখে তাকে ভাড়াটা চুকিয়ে দিলাম।

একজন ইহুদী ধর্মালম্বী ট্যাক্সি ড্রাইভার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে এমন ব্যথিত হয়েছেন এবং তার প্রতিক্রিয়া দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম।

 

আমাদের হোটেল থেকে ৫০০ গজের মতো দূরে একখানা গ্রোসারার দোকান বা মুদির দোকান ছিল। ঐ দোকানের মালিক ছিলেন একটু বয়স্ক মতো। একজন আফ্রো আমেরিকান ভদ্রলোক। ঐ দোকান থেকে আমরা চা-পাতা, চিনি, পাউরুটি, জ্যাম-জেলি কিনে আনতাম। দোকানের মালিক আফ্রো আমেরিকান ভদ্রলোক মনে হয় বেশ একটু শিক্ষিত ছিলেন। ঐ দোকানে প্রতিদিন যাওয়ায় আমরা তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়লাম। আমরা বাংলাদেশের লোক বলে বিশেষ করে শেখ মুজিবের দেশের লোক বলে তিনি আমাদের প্রতি অনেক সহানুভূতিশীল ছিলেন।

একদিন তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা খাওয়া-দাওয়া করি কোথায়?

বললাম, হিলটন হোটেলেই।

তিনি বললেন, হোটেলে তো খাবারের অনেক দাম। তোমরা একটা কাজ করো। পাঁচ ডলার দিয়ে একটি হটপ্লেট এবং রান্না করা যায় এমন ছোট একখানা পাত্র কিনতে পার। বললেন, তোমরা হোটেলে চাল ফুটিয়ে ভাতও রান্না করে খেতে পার। সবজি যদি শুধু কাঁচা মরিচ এবং পেঁয়াজ-লবণ দিয়ে রান্না করো তবে তোমাদের রুম গন্ধময় হবে না। তাছাড়া ডিম সিদ্ধ করে নিতে পার। এতে করে এক ডলার ব্যয় করে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেতে পারবে। তার পরামর্শ অনুযায়ী হোটেল রুমে রান্না করে আমি পরবতী‌র্কালে হাজার হাজার ডলার ব্যয় সাশ্রয় করেছিলাম।

একদিন ভদ্রলোক শেখ মুজিব প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন।

শেখ মুজিবের দেশের মানুষ বলে এই কালো মানুষটি আমাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। আমার শুধু একটা প্রশ্ন আমরা কি তার এই সহানুভূতি পাওয়ার উপযুক্ত?

সারাটা বিশ্বে নিপীড়িত বঙ্গবন্ধুর ভক্তের সংখ্যাই-বা কত হবে? নিজের কাছেই মনে হলো, সংখ্যাটা বহু কোটি হবে।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ