নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
১২ মে ২০২১, ০২:৪২ অপরাহ্ন

সুখ বড়ই অধরা

এম এ কবীর
মঙ্গলবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২১, ৯:২২ অপরাহ্ন
এম এ কবীর

ইংরেজ বেনিয়ার জাত। তারা বাণিজ্য বোঝে, সংস্কৃতি বোঝে না। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আলাউদ্দিন খিলজির আমলে যে রাগসঙ্গীত আমির খসরু উদ্ভাবন করেছিলেন অনেক যুগপর ইংরেজের হাতে তার নিধন শুরু হলো।

মোগল সা¤্রাজ্য ভেঙে পড়ল। যে দিল্লির রাজদরবারে ‘নবরতœ’ সভা এককালে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে, ইংরেজের নিষ্পেষণে সেই নবরতেœর চিহ্ন রইল না। এমনকি অনেক নবাবকেও ইংরেজরা তাদের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে।

তেমনই এক হতভাগা ছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ। তিনি ছিলেন অযোধ্যার শেষ নবাব। ১৮৫৬ সালে ইংরেজরা অযোধ্যা অধিকারে নেয়। শাসক ওয়াজেদ আলী শাহকে নির্বাসিত করে মেটিয়াবুরুজে। লক্ষেèৗর দরবারের আসর ভেঙে গেল। কিন্তু ওয়াজেদ আলী শাহ সঙ্গীতশিল্পীদের ছাড়েননি।

লক্ষেèৗ ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি বিদায়ের বেদনা প্রকাশ করে লেখেন।

বাবুল মোরা নৈহার ছুটহী জায়।

অঙ্গনা তো পর্বত ভয়ো

ঔর দেহরী ভয়ো বিদেশ

লে বাবুল পিয়া কী দেশ

সঙ্গ চলহী জায়।

চার কহার মিল ভুলিয়া মঙ্গাবে

অপনা বেগানা ছুটহী জায়।

(আমার প্রাণের দুলালী পিত্রালয় ছেড়ে যাচ্ছে। এই প্রাঙ্গণ পাথরসম, এই দেশ পরদেশের ন্যায় বোধ হচ্ছে। চারজন বেহারা পালকি নিয়ে এসেছে। পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সে পরিত্যাগ করে চলেছে।)

ঠুমরি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত পর্যায়ের একপ্রকার লঘু প্রকৃতির গান। গোলাম নবী সৌরি মিঞা খেয়াল গান থেকে ঠুমরি গানের উদ্ভাবন করেন।

নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। ব্রিটিশরা  দক্ষতার সঙ্গে তার রাজ্য শাসন সুনজরে দেখতে পারেনি। তারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে থাকে। এটা ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যমূলক হীনমনোবৃত্তি ছিল। এ দেশের রাজা-বাদশাহদের অদক্ষ ও বিলাসপ্রিয়রূপে প্রমাণ করে তারা কখনো প্রত্যক্ষভাবে, আবার কখনো পরোক্ষভাবে রাজ্যের শাসনভার দখল করে নিত।

‘ বাড়ির কাছে আরশী নগর‘র পরশিকে চিন্তার জগৎ থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। কারিগর, মেকার, ম্যানুফকচারার, ডিজাইনার বা সৃষ্টিকর্তা যে নামেই ডাকা হোক তাঁর অস্তিত্বের উপলব্ধিবোধ ভিন্ন নিজেকে জানতে চাওয়া মানে ‘ নিজে কানা পথ চিনে না…’।

রাজা বাদশাহদের সময়ে রাজ-দরবারে নিয়োগ দেয়া হতো বংশি বাদক। যখনই রাজার মনে সুর চাইতো হুকুম দিলেই সুর বেজে উঠতো। এখন রাজা বাদশাহও নেই, বংশি বাদকও হাতে গোনা। হাট বাজারে মাঝে-মধ্যে বাঁশির সুর বেজে উঠে। বাঁশির এ সুর গিয়ে বেঁধে মানুষের বুকে। বাঁশির সুরেই অতীতে ফিরে যান অনেকে। বাঁশিই এক সময় হয়ে ওঠে বিরহের মালা। তখনও দরাজ কণ্ঠে ভেসে আসে – বাঁশি শুনে আর কাজ নেই/ সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি।

বর্তমান প্রজন্ম বাঁশি নিয়ে আর খেলা করে না। আধুনিকতায় তারা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। মুনি ঋষিরা বলেছেন – আত্মনং বিদ্ধি। ‘নিজেকে জানো’। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথর।  মানুষ নিজের আত্মাকে খুঁজে বেড়ায় নিজেকে চেনার জন্য। সত্যিই সবার আগে দরকার নিজেকে চেনার, নিজেকে জানার। আর নিজেকে চেনা ও জানার মাধ্যমেই ভুল-ত্রæটি শুধরে নেয়া সম্ভব। কে আমি। কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাচ্ছি? এ জটিল বিশে^ আমার কি ভূমিকা, মানুষের ভালো করার জন্য আমি কি করতে পারি? এসব নিয়ে মানুষকে ভাবতে বলেছেন, চিন্তা করতে বলেছেন।

মৌসুমি পাগল। সারা বছরই ভালো থাকতো, বছরের একটা সময় পাগল হয়ে যেত। পাগল হলে  সে বাড়িতে কাউকে ঢুকতে দিতো না। পাড়ার ‘মৌসুমী কবিরা’ সেই পাগল বাড়ির দেয়ালে লিখে দেয়- কর্তা পাগল,গিন্নি পাগল/ পাগল দুই চেলা/সেথা সাত পাগলের মেলা।

মুনি,ঋষি, রবীন্দ্রনাথ,শেক্সপিয়র,গ্রিক দার্শনিক সবাই লম্বা ‘সফেদ’ দাড়ির অধিকারী ছিলেন। তারা নিজেকে চেনার জন্য, জানার জন্য এতই ব্যস্ত ছিলেন, সেভ করারও সুযোগ পাননি জীবনে।

ঋষিরা সেজন্যই বুঝি পরামর্শ দিয়েছেন আগে নিজেকে জানো। আর নিজেকে জানলে, অন্যকে জানারও সুযোগ হবে। তখন বংশিবাদক বাঁশিতে সুর টান দেবে।

বাঁশি শুনে আর কাজ নেই/ সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি/ সে যে দিন-দুপুরে চুরি করে

রাত্রিরেতে কথা নাই/ ডাকাতিয়া বাঁশি/ বাঁশেতে ঘুণ ধরে যদি/ কেন বাঁশিতে ঘুণ ধরে না/ কতজনায় মরে শুধু পোড়া বাঁশি কেন মরে না/ বাঁশি শুনে আর কাজ নাই সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি।

বাঁশি সর্বনাশা। বাঁশির সুরের উত্তাল মূর্ছনায় কতোজন উন্মাদ হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। আবার কতোজনকে যে কাঁদিয়েছে তারও কোনো ইয়ত্তা নেই।

সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে লতা মঙ্গেস্কর কেঁদেছিলেন এই বাঁশির সুরেই।

-ও বাঁশী কেন গায় আমারে কাঁদায়, কে গেছে হারায়ে স্মরণের বেদনায়- কেন মনে এনে দেয়।

লতার মনের গহীনে কখন যেন ঐ বাঁশির সুর আনন্দ ও ছন্দের ঢেউ তুলেছে। বাশির সুর আর ফাগুনের গন্ধ মিশে একাকার হয়ে যায়। আর বিরহের বেদনায় তাঁকে মূর্ছিত করে।

-ও বাঁশী কখনও আনন্দ ছিলো জীবনের ছন্দে- হৃদয় মাতাল হতো ফাগুনের গন্ধে, সে যেন কোথায় আমি বা কোথায়, যদি না জানা।

ডাকাতিয়া বাঁশি কি কোনো কালে কখনো নিজেকে জেনেছে? সে যে কাউকে কাঁদায়, কাউকে হাঁসায়। এটাই তার জন্মের সার্থকতা। নিজের পরিচয় জানতে পারলে তার এই হাঁসা কাঁদার খেলা হয়তো খতম হয়ে যেতো। তবে আমাদের সামাজিক সুস্থিরতার জন্য আমরা নিজেদেরকে চিনতে পারাটা জরুরি। আমাদের বর্তমান,অতীত ও ভবিষ্যতের পরিনতি অর্থাৎ এমূহুর্তে আমাদের কি করা উচিত, অতীতে আমরা কোথায় কিভাবে ছিলাম, আমাদের সৃষ্টি রহস্য, আমাদের মৃত্যু, মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সুখ দুঃখ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা উচিত।

পবিত্র কুরআন মজিদে এসম্পর্কে বিস্তারিত নসিহত করা হয়েছে। মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

-যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন এবং মানব সৃষ্টির সূচনা করেন কাদামাটি থেকে। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন নোংরা ও তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে। পরে তিনি তাকে ঠিকঠাক করলেন এবং তার মধ্যে তিনি তাঁর নিজের কাছ থেকে রূহ ফুঁকে দিলেন এবং তোমাদের জন্য তাতে কান, চোখ ও অন্তকরণ দান করলেন। তোমাদের খুব কম লোকই শোকর ও কৃতজ্ঞতা আদায় করে। অস্বীকার কারীরা বলে, আমরা যখন মাটিতে মিশে যাবো,আবার কি আমাদের নতুন করে পয়দা করা হবে? এরা তাদের মালিকের সাথে সাক্ষাতের বিষয়টিকে অস্বীকার করে। হে নবী, তুমি বলে দাও জীবন হরনের ফেরেশতা – যাকে তোমাদের ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, অচিরেই তোমাদের জান কবজ করে নেবে। অতপর তোমাদের সবাইকে মালিকের দরবারে ফিরিয়ে নেয়া হবে। (সূরা আস সাজদা, আয়াতঃ ৭-১১)

নিজের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে যে বুঝতে সক্ষম হয়, তাকে একদিন তার সৃষ্টি কর্তার কাছে ফিরে যেতে হবে এবং সেই বিশ^াস ধারণ করে সে এই নশ^র জগতে আল্লাহর নির্দেশ মতো কাজ করে তার জন্য রয়েছে পরকালে পুরষ্কার।

আল্লাহ বলেন, – যারা আল্লাহ তায়ালার উপর ঈমান এনেছে এবং সে অনুযায়ী নেক আমল করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদৌস। সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। সেখান থেকে তারা অন্য কোথাও যেতে চাইবেনা। ( সূরা আল কাহাফ,আয়াত ঃ ১০৭)

আবার পরকালে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের কথা আল্লাহ তায়ালা বলেন, – হে নবী তুমি বলে দাও, আমি কি তোমাদের এমন লোকদের কথা বলবো, যারা আমলের দিক থেকে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত। এরা সেসব লোক যাদের সমুদয় প্রচেষ্টা এ দুনিয়ায় বিনষ্ট হয়ে গেছে। অথচ তারা মনে মনে ভাবছে, তারা ভালো কাজই করে যাচ্ছে। এরা হচ্ছে সেসব লোক যারা তাদের মালিকের আয়াত সমুহকে অস্বীকার করে এবং মালিকের সাথে সাক্ষাতের বিষয়টিও অস্বীকার করে। ফলে তাদের সব কর্মই নিষ্ফল হয়ে যায়। তাই কিয়ামতের দিনে আমি তাদের জন্য ওজনের কোনো মানদন্ড স্থাপন করবোনা। এটাই জাহান্নাম, তাদের যথার্থ পাওনা। কেননা তারা অস্বীকার করেছে এবং আমার আয়াত সমূহ ও রাসুলদের বিদ্রæপ করেছে। (সূরা আল কাহাফ,আয়াত- ১০৩-১০৬)।

সুখ দু’টি অক্ষরের একটি শব্দ। এ সুখ বড়ই অধরা। জীবনে ক’জন বলতে পেরেছেন, আমি সুখী। এমন সুখী মানুষ মেলা ভার। কি ব্যক্তি জীবনে, কি সংসারে, কি সমাজে, কি রাষ্ট্রে সর্বত্র সুখ যেন অধরাই রয়ে যায়। আর এমন অধরার পেছনে দায়ী কে? সমাজ, রাষ্ট্র না মানুষ? উত্তর খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। তবে আপাতদৃষ্টিতে দায়ী যেন মানুষ।

আমরা কেউ সুখী হোক তা চাই না। আর চাই না বলেই কেউ সুখী নন। ব্যক্তি জীবনে কারা সুখী? কেউ কি নিজেকে সুখী বলতে পারছেন। কারও অর্থ নেই তাই তিনি অসুখী। আবার কারও এতো অর্থ যে,তা নিয়ে তিনি অসুখী। সংসারের কথাই ধরা যাক। এখানে স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা। এ ক’জনই একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না। সংসারে লেগে থাকে অশান্তি, ঝগড়া আর কলহ। পালিয়ে যায় সুখ। ভর করে অসুখ আর অশান্তি। সংসারের কর্তা পুত্র কিংবা স্বামীর মনও থাকে খারাপ। হাজার চেষ্টা করেও সুখের দেখা পান না। কেউ যদি তর তর করে এগিয়ে যেতে থাকেন তাহলেই বিপদ। সমাজের অন্য অনেকের জন্য হবে এটা ঈর্ষার কারণ। তারা লেগে পড়বেন পেছনে। তাকে ছাড়া যাবে না। অপরাধ- তিনি কেন সমাজে এগিয়ে যাচ্ছেন? কোনো খুঁত বের করে তাকে ধরতেই হবে। কি করা যায়। কাউকে না কাউকে দিয়ে প্রথমে লাগাতে হবে ঝগড়া। এরপর মামলা-মোকদ্দমা। যাও সুখের দেখা পেতে যাচ্ছিলেন তিনি, তা আর তার নাগালে রইলো না। ছিটকে গেল হাজার মাইল দূরে। তার সঙ্গে স্বজনদের সুখও উবে গেল। আর রাষ্ট্রে সে তো বড় এক ঝামেলা। সরকারকে কখনো স্বস্তিতে থাকতে দেয়া যাবে না- এ হলো বিরোধী দলের পণ। আর বিরোধী দলকে কখনোই সামনে বাড়তে দেয়া যাবে না- এ পণ সরকারের।  যে অশান্তিতে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয় জনগণ।

করোনা সুখ কেড়ে নিয়েছে গোটা বিশে^র। লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে। ঘুম হারাম বিজ্ঞানীদের। আশার আলো দেখে যাচ্ছে মানুষ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুখ কেড়ে নিয়েছে নির্বাচন। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা আছে। ক’দিন পর পর তা গোলাবর্ষণের মাধ্যমে জানান দেয়। চীনের সুখ নেই এই ভেবে, কীভাবে বিশে^ তার শক্তিমত্তার জানান দেবে তা নিয়ে। দেশে এখন উত্তেজনা চলছে ভাস্কর্য আর মূর্তি এক কিনা তা নিয়ে। এতে ঘুম হারাম দু’পক্ষের। না, সুখ নেই কোথাও।

যে যেভাবে পারে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। পিছু টেনে ধরছে অন্যরা। ফলে সেখানেও অশান্তি। তাই সুখ যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে যায়। সুখ আর ধরা দেয়না জীবনে, সংসারে, সমাজে, রাষ্ট্রে।

নিজেকে জানার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম জানা দরকার আমার সৃষ্টিরহস্য,পরিচয়। জানা প্রয়োজন শেষ পরিনতি।

আমরা হেন অন্যায় নেই যা অবলীলায় করে যাচ্ছি, সেগুলোকে সত্য,ন্যায়ানুগ,বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করছি।

বাঁশি কখনো কাঁদায় আবার কখনো হাঁসায়। তবে নিজেকে সঠিক ভাবে চিনতে ব্যর্থ হলে পরকালের অনন্ত জীবনে শুধু কাঁদতেই হবে।

 

লেখক

সাংবাদিক

কলামিস্ট, গবেষক, সমাজ চিন্তক।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ