বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট পলাশীর নীলক্ষেত যেন পলাশী প্রান্তর

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
মঙ্গলবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৩, ৯:০৩ অপরাহ্ন

রাজধানীর নীলক্ষেত-পলাশীতে শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ব্যানবেইস ভবনে অবস্থিত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর–সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অস্থায়ী কার্যালয়। ১৯৯০ সালে শিক্ষক কর্মচারীদের দাবীর প্রেক্ষিতে অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের কল্যাণে গঠন করা হয়েছিলো এই সংস্থাটি।

১৯৯০ সালের ২৮ নং আইনে এবং ১৯৯৯ সালের প্রবিধানমালায় কল্যাণ ট্রাস্ট এবং ২০০২ সালের ২৭ নং আইনে ও ২০০৫ সালের প্রবিধানমালায় অবসর সুবিধা বোর্ড গঠন করা হয়। এই দুটি সংস্থার আর্থিক যোগান দাতা শিক্ষক কর্মচারীদের মাসিক চাঁদা, দান ও সরকার প্রদত্ত বরাদ্দ ও অনুদান।

উল্লেখিত দুটি আইনে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন স্কেল থেকে মাসিক কল্যাণ ট্রাস্টে ২% টাকা এবং অবসর সুবিধা বোর্ডে ৪% মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। উক্ত আইনে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের অবশিষ্ট ঘাটতি পূরণ করবে সরকার। অথচ অবসর ও কল্যাণ–সুবিধার টাকা পেতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের সচিবদ্বয় বলছেন অর্থের অভাবেই নাকি এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

তাই অর্থের ঘাটতি পূরণে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশের পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারীদের সামান্য বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪% চাঁদা কর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, শুধুমাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের চাঁদা দিয়েই যদি অবসরে যাওয়া শিক্ষক কর্মচারীদের দায় মিটানো হয়, তবে এই অবসর কল্যাণ ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? এক্ষেত্রে সরকারের দায় বাঁ ভূমিকা কী? আর স্বগোত্রীয় পরিচালনা কমিটির শিক্ষক নেতাদের ভূমিকাই বাঁ কী?

একটি উদাহরণ – আইন অনুযায়ী অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে চাঁদার হার বেতন স্কেলের ৬%। তদানুযায়ী পূর্বে ১০ গ্রেডের একজন শিক্ষকের মাসিক চাঁদার পরিমাণ ছিল ৪৮০ টাকা। জাতীয় পে কমিশনে বর্ধিত বেতনস্কেলে একজন শিক্ষকের ৬% হারে চাঁদা দাড়ায় ৯৬০ টাকা। অর্থাৎ শিক্ষকরা দ্বিগুণ হারে নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করে আসছিলেন। এতদসত্ত্বেও অতিরিক্ত ৪% চাঁদা কর্তনের ফলে একজন শিক্ষককে বাড়তি চাঁদা গুনতে হয় ৬৪০ টাকা। অর্থাৎ ১০ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির ফলে বাড়তি চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাসিক ৪৮০ + ৬৪০ = ১১২০ টাকা। অথচ দেশের পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারীরা অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টে তাদের কত টাকা জমা হয়েছে তা জানার সুযোগ তাদের নেই। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যয়ের স্বচ্ছতার পরিসংখ্যানও শিক্ষকদের অজানা। এমনকি দুরারোগ্য ব্যাধিতে কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে আর্থিক সহায়তার বিধান থাকলেও শিক্ষক কর্মচারীরা পেয়েছেন এমন নজির খুবই নগণ্য। অনিয়ম, ঘুষ, দূর্নীতি, একই ব্যাক্তিকে একাধিকবার চেক প্রদান, একজনের চেক অন্যজনকে প্রেরণ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা না রেখে তফসিলি ব্যাংকে টাকা জমা সহ বিভিন্ন অভিযোগ তো রয়েছেই। বিধি বিধান উপেক্ষা করে বাড়তি সুবিধা না দিয়ে জোর পূর্বক বেতন থেকে অতিরিক্ত টাকা কর্তন সম্পূর্ণ অমানবিক, অবৈধ ও অসাংবিধানিক। শিক্ষকরা বিভিন্নভাবে বঞ্চনা বৈষম্যের শিকার হয়েও সারা জীবন দেশের সেবা দিয়ে অবসরে যাচ্ছেন। অবসর পরবর্তীতে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি ও আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেখানে অবিবেচনা প্রসূত অতিরিক্ত চাঁদার হার বাড়িয়ে শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে ব্যপক ক্ষোভ ও বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। যৎসামান্য বেতন থেকে অতিরিক্ত টাকা কেটে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধ করতে হবে কেন? এমন সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

অবসর কল্যাণ ট্রাস্টের আইন অমান্য করে অতিরিক্ত চাঁদা কর্তনের প্রতিবাদে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মহলে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে অবহিতকরণ করা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোন প্রকার কর্ণপাত না করে ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত চাঁদার প্রজ্ঞাপনটি বারংবার জারি করে তা বাস্তবায়ন করেছে। বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে যে, জোর যার মুল্লুক তার। এছাড়াও শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর পরবর্তী তিন/চার বছর ধরে চোখের জল ও দীর্ঘশ্বাস ফেলার জায়গা যেন রাজধানীর পলাশীর নীলক্ষেত। শিক্ষকদের অতি আকাংখার সংস্থা দুটিই শিক্ষকদের বঞ্চনা, বৈষম্য ও বিরম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই রাজধানী নীলক্ষেত আজ যেন সেই ‘৫৭ পলাশীর প্রান্তরে পরিনত হয়েছে। সল্প আয়ের শিক্ষক কর্মচারীরা মন থেকে কখনোই এ জুলুম অন্যায় আদেশ মেনে নিবে না। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টে অর্থের ঘাটতি পূরণে শিক্ষামন্ত্রণালয়কে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি বিকল্প অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। নচেৎ এই অমানবিক কর্তনের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক কর্মচারীদের অব্যাহত প্রতিবাদ চলছে- চলবেই।

দেশের পাঁচ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের শেষ আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সমীপে। যথাযথ সম্মান ও বিনয়ের সাথে অনুরোধ, প্রতিষ্ঠানের স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ও আয় সরকারি কোষাগারে নিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের ঘোষণা দিন। এতে বিশৃঙ্খল শিক্ষার মানোন্নয়ন সহ আপনার সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আপনি ইতিহাসে চিরকাল স্বরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন- ইনশাআল্লাহ।

লেখক

সভাপতি

বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


আরো সংবাদ
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com