নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
২৮ অক্টোবর ২০২১, ০২:২৬ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে বিশ্ববাসি মনে রাখবেন।

লেখকঃ মোঃ হায়দার আলী
বৃহস্পতিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

 

মহান ও নিবেদিত পেশা হিসেবে শিক্ষকতা সর্বজন স্বীকৃত। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবেই মনে করা হয় শিক্ষকদের। পাঠদানে আত্ম-নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিহিত থাকা সুপ্ত মেধা জাগ্রত করা, দুঃস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিজের অর্থ ব্যয়ে দেশ সেরা হিসেবে গড়ে তোলা শিক্ষকও দেশে বিরল নয়।
এ জন্যই সমাজে শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, শিক্ষার্থীরাও যুগে যুগে স্মরণ রাখেন। করনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনাভ্যাস। আমাদের চারপাশে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা ভর করে বসেছে। খাদ্যের অনিশ্চয়তা, চাকরি থাকা না থাকার অনিশ্চয়তা, সন্তানের পড়ালেখার অনিশ্চিয়তা, চিকিৎসার অনিশ্চিয়তা, করোনায় মৃত্যু হলে দাফন কাফনের অনিশ্চয়তা। দেশে দেশে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পড়ছে শ্রমিক। কলকারখানায় থেমে গেছে উৎপাদনের চাকা। এদিকে গত বছর এপ্রিল মাসের রপ্তানি আয় দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। সরকারের রাজস্ব আদায় হ্রাস পেলেও বৃদ্ধি পেয়েছে রাজস্ব ব্যয়। ব্যয় মেটাতে সরকারের ঘাড়ে বাড়ছে ঋণের চাপ। দেশে দেশে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে। এমন এক অনিশ্চিত বিশ্বে শিক্ষা ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।

বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৮৮টি দেশের শিক্ষার্থীরা করোনাকালে সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাধাগ্রস্ত হয়েছে তাদের শিক্ষাকাল। স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর গত ১২/০৯/২০২১ ইং তারিখ হতে ১৯ নির্দেশনা দিয়ে সপ্তাহে ১ দিন ক্লাস করা অনুমতি দিয়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলে দেয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের করোনা ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে লেখার জন্য তথ্য উপাত্ত নিয়ে বসলাম এমন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, পত্র পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা, টিভি চ্যালেনগুলিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন, তাই লেখার থিম পরিবর্তন করে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে লেখা শুরু করলাম।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন ছিল। ১৯৪৭ সালের এই দিনে তিনি জন্মলাভ করেন। আমরা এ উপলক্ষে তাকে আন্তরিক ও অকুণ্ঠ শুভেচ্ছা জানিয়েছি। আমরা জানি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে তিনি এখন ওয়াশিংটন রয়েছেন। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানেই থাকবেন। তাই এবারের জন্মদিন তিনি সেখানেই কাটাবেন।

তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ইতোমধ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। পার্টির শুভেচ্ছা বার্তায় বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা জোরদার করার সদিচ্ছাও ব্যক্ত করা হয়েছে ওই বার্তায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এযাবৎকালে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে দলীয় সভানেত্রী। একই সঙ্গে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে তিনি দেশ ও সরকার পরিচালনা করছেন। তাঁর, তাঁর দল ও সরকারের সঙ্গে এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান, ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শুভেচ্ছা তারই সাক্ষ্য বহন করে। শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। এরপর দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি অতীতে বিরোধী দলীয় নেত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। জাতীয় নেত্রী হিসেবে এ দীর্ঘ সময়কালে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার ও পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যে বিরল ও অভূতপূর্ব কৃতিত্ব তিনি দেখিয়েছেন, দেশে তার কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। বহির্বিশ্বের অনেক দেশেও এমন নেতৃগুণসম্পন্ন, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতা দেখতে পাওয়া যায় না। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠার পাশাপাশি বিশ্বনেতা হিসেবেও তাঁর অনিবার্য স্বীকৃতি মিলেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য, সন্দেহ নেই, অত্যন্ত গৌরবজনক ও মর্যাদাকর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠকন্যা। কথায় বলে: বৃক্ষের পরিচয় ফলে। এক্ষেত্রেও সেটা বিশেষভাবে লক্ষ্যযোগ্য। শেখ হাসিনাকে দেখে বুঝতে মোটেই অসুবিধা হয় না যে, তিনি বঙ্গবন্ধুরই কন্যা। ব্যক্তিত্ব, আচার-আচরণ, সভ্যতা-ভব্যতা, শিক্ষা-দীক্ষা, আদর্শনিষ্ঠা, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণ করার দৃঢ় প্রত্যয় ইত্যাদি দিক দিয়ে তাঁর সঙ্গে একমাত্র বঙ্গবন্ধুকেই তুলনা করা যায়।

বাংলাদেশ মানেই যেমন বঙ্গবন্ধু, তেমনি শেখ হাসিনাও তাঁর পিতার মতো প্রতীক ও পরিচয়ের পতাকা হিসেবে নিজেকে বিভূষিত করেছেন। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে, তাঁর পরিচিতির সঙ্গে শেখ হাসিনাও এক অপরিহার্য নাম। শেখ হাসিনা নানা উপলক্ষে প্রায়ই বলে থাকেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য। জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণ ছাড়া তাঁর আর কোনো অভিপ্রায় নেই। উন্নত, আধুনিক, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা তার সমস্ত কর্মের অনুপ্রেরণা। দেশ ও জাতীয় উন্নয়ন-সমৃদ্ধি ছাড়া কোনো জাতীয় নেতার আর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এজন্য জীবন দিতেও তিনি সদাপ্রস্তুত থাকেন।

বিভাজিত ভারতবর্ষের পাকিস্তান অংশের প্রথম রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত চলা পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন। দ্বিতীয় তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটি হচ্ছে ছয় দফা আন্দোলন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন। ছয় দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। ৬ দফাকে কেন্দ্র করেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ১৯৭১ এর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সের মাঠে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিজয় অর্জন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ইতিহাসে এই প্রথম ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম আধুনিক রাষ্ট্রের মালিকানা লাভ করল। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি তাঁর রাষ্ট্রের মালিকানা হারিয়ে ফেলে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পরে যা অবশিষ্ট থাকল সেটাকে কোনভাবেই আর বাংলাদেশ বলা যাবে না। দেশটাকে পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তর করা হয়েছিল। একটা ঘটনা উল্লেখ করলেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে। স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, তারিখ ৭ মার্চ; শুধু সালটা ১৯৭৬। যেই রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ যেখানে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, স্বাধীনতাবিরোধীরা মনে করত, মুসলমান এবং পাকিস্তান সমার্থক। মুসলমানের পরাজয় হতে পারে না।

১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ওই সীরাত সম্মেলন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জি তোয়াব জিয়াউর রহমান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সীরাতে উপস্থিত পাকিস্তানের সমর্থক গোষ্ঠি স্লোগান তুলেছিল, ‘তোয়াব ভাই তোয়াব ভাই, চাঁদ-তারা পতাকা চাই’। এমন একটি বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করেছিল বঙ্গবন্ধুর নামটিও কেউ মুখে নিতে পারত না।

৪ আগস্ট ১৯৭৬, তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়াউর রহমান পিপিআর ঘোষণা করে। তাতে বলা হয়, ‘কোন ব্যক্তি বিশেষের প্রতি ভক্তি বা বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে এমন কোন নাম দল গঠনের প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্রে উল্লেখ থাকতে পারবে না।’ ৪ নভেম্বর ১৯৭৬, জিয়াউর রহমান সরকার বঙ্গবন্ধুর নাম কেটে দিয়ে আওয়ামী লীগকে দল করার অনুমতি নিতে বাধ্য করে। ৩১ আগস্ট ১৯৭৬, খান আতা ও আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা জেনারেল জিয়ার সাথে দেখা করতে গেলে সিনেমা থেকে শেখ মুজিবের নাম মুছে ফেলার প্রস্তাব আসে। তৎকালীন তথ্য সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফা তা দ্রুত কার্যকরের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন। বঙ্গবন্ধুর ছবি ও নামের উপর কালি লেপনের নির্দেশনা জারি করেন।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বিদেশে অবস্থান করায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। শুরু হয় রূপান্তরিত পূর্ব পাকিস্তানকে আবার বাংলাদেশের ধারায় ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। বাঙালির বুকে আশার সঞ্চার হয় বাংলাদেশকে আবার ফিরে পাওয়ার । এর মধ্যেই সহস্রাধিক সেনা সদস্যকে সামরিক বিচারিক প্রহসনের মাধ্যমে হত্যাকারী জিয়াউর রহমান একদল সেনা সদস্য কর্তৃক চট্টগ্রামে নিহত হন।

কয়েকদিন ধানাই-পানাই করে বিচারপতি সাত্তারকে তাড়িয়ে ক্ষমতা দখল করেন অপর স্বৈরশাসক হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ এক ধাপ এগিয়ে রাষ্ট্রের ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে চিরতরে বিতাড়িত করার জন্য রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামকে সামনে নিয়ে আসলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচন। কিন্তু ১৯৯১ এর নির্বাচনে গণতন্ত্র মুক্তি পেল না। সামরিক শাসক জিয়া এরশাদের মতোই গণতন্ত্র অবরুদ্ধ থাকলো ক্যান্টনমেন্টে। শহীদ নূর হোসেনের বুকে লেখা গণতন্ত্র পুরোপুরি মুক্তি পেল না। গণতন্ত্র থেকে গেল সেনানিবাসেই। সেনানিবাসে থেকে গেলেন আমাদের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। রয়ে গেল পাকিস্তানি ভাবধারা।

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে এদেশের মানুষ দীর্ঘ দেড় দশক পর গণতন্ত্রের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলেও কুশীলবদের সূক্ষ্ম কারচুপির কারণে গণতন্ত্র ক্যান্টনমেন্টেই থেকে গেল। সেনানিবাস থেকেই গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশ শাসন করতে লাগলেন। সামরিক গোয়েন্দাদের খবরদারি থেকে গেল সরকার ব্যবস্থায়। পরবর্তী সময়ে আরো দু’টি নির্বাচনে ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ ও পরে ২০০১-এ বিএনপি ক্ষমতায় এলেও বিরোধীদলের নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী সেনানিবাসে থেকে গেলেন। পাকিস্তানি কায়দায় সামরিক গোয়েন্দারা সবকিছুতেই খবরদারি করছিল। এই সময়ে ঘটে ইতিহাসের আরেকটি নৃশংস হত্যার ঘটনা, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে, সকল গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে তৎকালীন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে সদলবলে হত্যায়ই ছিল এই গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্য। নারী নেত্রী বেগম আইভি রহমানসহ অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত আহত হন এই গ্রেনেড হামলায়। আল্লাহর অসীম কৃপায় বেঁচে গেলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। ক্যান্টনমেন্টে বসে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাই দেশ চালাতেন তার প্রমাণ মেলে ১/১১ এর ষড়যন্ত্রের সময়ও। প্রকাশ পেতে থাকে ব্রিগেডিয়ার আমিন-বারীদের হাতেই বন্দী ছিল গণতন্ত্র। সেনানিবাসের মইনুদ্দিনরাই জোগাড় করেছিল ফকরুদ্দিনদের। এদেশের গণতন্ত্র বিনাশী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সেনানিবাসে জন্মগ্রহণ ও নেতৃত্বের সেনানিবাসে অবস্থানকারী রাজনৈতিক দলটির সম্পৃক্ততা সন্দেহাতীত।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একটি টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে ২০০৯ সালের পরবর্তী সময়ে দেশের সেনানিবাসে জন্মানো রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্বকে আইনসম্মতভাবে সেনানিবাসের বাইরে নিয়ে আসা। আর সেটা সম্ভব হয়েছে সেনানিবাসে অবস্থানকারী দলটির নেত্রীকে সেনানিবাস থেকে বের করে আনার মধ্য দিয়ে। এর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি ভাবধারায় যে দেশ চলছিল

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালিত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্যভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। আর সেটার নেতৃত্বে অবশ্যই দিচ্ছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। যে দেশটি অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে পড়েছিল, ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষের দারিদ্র্য নিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী উত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেটাই আজকে বিশ্বে উন্নয়নের বিস্ময়। ১৯৭২-৭৩ থেকে শুরু করে ২০০৬-৭ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছর সময় লেগেছিল মাথাপিছু আয় ৫৩২ ডলারে আসতে। ২০০৭-৮ থেকে ২০১৯-২০ এসে মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় ২০৬৪ ডলারে। ১১ বছরে প্রায় চারগুণ হয়েছে। ২০২১ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২২২৭ ডলার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হচ্ছে নেতৃত্বের দূরদর্শিতা।

নেতৃত্বের দূরদর্শিতা কীভাবে একটা জাতিকে উন্নয়নের পথ দেখায় তা বুঝার জন্য একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চগড় সফরে গেলেন। নেত্রীর অগ্রগামী দল হিসেবে আমরা যারা যুবলীগের নেতৃত্বে ছিলাম আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। বিকেলে সবাই যখন চা খাচ্ছিলাম তখন প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ করেই বলে বসলেন, ‘ভারতের দার্জিলিং এ যদি চা চাষ হতে পারে, তাহলে পঞ্চগড়ে কেন হবে না’। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. রবিউল হোসেন। সম্ভাবনা যাচাই করতে তিনি মৌলভিবাজার থেকে চারা সংগ্রহ করে টবে লাগালেন। ২৫ বছর পর এখন পঞ্চগড়ে প্রায় ৩০০০ হেক্টর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। ২০১৭ সালে উৎপাদন ছিল ৫৫ লক্ষ কেজি। বছরে তিন কোটি কেজি চা উৎপাদন সম্ভব।

শেখ হাসিনার মনোবল কত দৃঢ় এবং সিদ্ধান্তে কতটা অবিচল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে। দেশি-বিদেশি সকল চাপ উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তিনি ছিলেন আপোসহীন। এছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে মুখের উপর গ্যাস রপ্তানির সুযোগ নাকচ করে দিয়েও তার অদম্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ। দেশি-বিদেশি চক্রান্তে কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থা যখন অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ালো তখন কাল বিলম্ব না করে শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিলেন পদ্মাসেতু হবে নিজস্ব অর্থায়নে এবং হয়েছেও তাই। পদ্মাসেতু এখন বাস্তবতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালিরে কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না’। বঙ্গবন্ধুর এই উক্তির স্থাপত্য রূপ হচ্ছে পদ্মাসেতু।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সততা এবং দুর্নীতিমুক্ত থাকার কারণে বিশ্ব দরবারে অনন্য এক উচ্চতায় আসীন হয়েছেন। সম্প্রতি ইউরোপের একটি গবেষণা সংস্থা ‘পিপলস এন্ড পলিটিক্স’ বিশ্বের ৫ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করেছেন যাদের কোনো দুর্নীতি স্পর্শ করেনি। এদের বিদেশে কোনো ব্যাংক একাউন্ট নেই, উল্লেখ করার মতো সম্পদও নেই।

১৭৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে স্কোর করা হয়। এই তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, তাঁর স্কোর ৯০। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং, স্কোর ৮৮। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮৭ স্কোর পেয়ে তালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলবার্গ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান অধিকার করেন, তাঁদের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৮৫ এবং ৮১ । এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের ৭৮ শতাংশ মানুষ মনে করে শেখ হাসিনা দুর্নীতিমুক্ত এবং লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। ছোটখাটো দুর্নীতিও তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

চলমান করোনা মহামারীর গত এক বছরেও সারাদেশে ৫০ লাখ পরিবারকে আর্থিক মানবিক সহায়তার নতুন রেকর্ড তৈরি করেছেন শেখ হাসিনা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল। পূর্ব থেকেই আরো ৫০ লাখ পরিবারের দুই কোটি সদস্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে ছিল। এর আওতায় ভিজিএফ কার্ড, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, শিক্ষা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, স্বামী পরিত্যাক্তাদের জন্য ভাতা ইত্যাদি চালু করে একটি উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আদর্শ মডেল হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই স্থান করে নিয়েছে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সর্বশেষ মাইলফলক উদাহরণ হচ্ছে গৃহহীনদের গৃহদান। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এই মুজিববর্ষে সাড়ে ৮ লক্ষ গৃহহীন মানুষকে পাকা ঘর তৈরি করে দিচ্ছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বড় দুস্থদের জন্য গৃহায়ন প্রকল্প। বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মানবিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। জাতিসংঘের চলতি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যে মানবতা দেখিয়েছেন তা মনে রাখবে বিশ্ববাসী।’ জাতিসংঘের কার্যক্রমে বিশ্ব শান্তি রক্ষায়, জলবায়ু পরিবর্তন ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মমত্ববোধ, মানবিকতা, মহানুভবতা ও উদারনৈতিক মানসিকতার জন্য ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ অভিধায় অভিহিত করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য মুক্ত করে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জনসাধারণের ক্ষমতায়ন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্ব জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বের বহু খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে এবং পদকে ভূষিত করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় এবছর জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘জুয়েল ইন দি ক্রাউন অফ দি ডে’ (মুকুট মণি) হিসাবে আখ্যায়িত করেছে।
সামাজিক কর্মকাণ্ড, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা সম্মানিত করেছে। আমরা একান্তভাবেই আশা করি। দেশে-বিদেশে শেখ হাসিনা যে, প্রশংসনীয় ইমেজ গড়ে উঠেছে, তা আরও বিকশিত হোক, তিনি দীর্ঘজীবী হোন, একামনায় শেষ করলাম।

মোঃ হায়দার আলী
সভাপতি,
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা;
সাধারণ সম্পাদক, গোদাগাড়ী প্রেসক্লাব।

প্রধান শিক্ষক
মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়,
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।
তারিখঃ ৩০/০৯/২০২১ ইং

 

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ