নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:১২ পূর্বাহ্ন

কৃষিতে চাই মৌলিক গবেষণা

প্রফেসর ড. মো. গিয়াসউদ্দীন মিয়া
মঙ্গলবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২১, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হলো গবেষণা। যে জাতি গবেষণায় যত উন্নত, সেই জাতি সার্বিকভাবে ততই উন্নত। এজন্য গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি ও উন্নয়নে গাজীপুরস্থ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে  নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কৃষি ও কৃষি-সম্পর্কিত মৌলিক গবেষণা পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান। বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও পশুচিকিত্সা বিজ্ঞানে মৌলিক জ্ঞান সৃজনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য রেখে চলেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ আধুনিক কৃষির নানা বিষয়ে অনেকগুলি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়টির ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

এখানে উল্লেখ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা উৎকর্ষকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে বিশ্বমানের গবেষণা যন্ত্রপাতি সংবলিত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরি ও ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং নিরাপদ খাদ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট চেইঞ্জ (আইসিসি) ও ইনস্টিটিউট অব ফুড সেফটি অ্যান্ড প্রসেসিং (আইএফএসপি) নামে আরও দুটি ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে এবং শিগগিরই এ সব ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম শুরু হবে। পরিবেশ উন্নয়ন ও বন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি ও গবেষণা পরিচালনার জন্য ‘বন ও পরিবেশ’ বিষয়ে একটি অনুষদ খোলার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন অ্যাগ্রো-মেটাঅরোলোজিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাগ্রো-মেটাঅরোলোজি বিভাগ চালুর অনুমোদনসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও ইম্ক্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি এ পর্যন্ত ধানসহ অন্যান্য অর্থকরী ফসল, সবজি ও তৈল জাতীয় ফসলের ৬০টির বেশি উচ্চফলনশীল জাত ও ১৪টি কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিসমূহ কৃষি উন্নয়নে অনন্য অবদান রেখেছে বিশেষ করে বিইউ ধান ১ এবং মুগডালের জাতসমূহ বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে মঙ্গা দূরীকরণে; সয়াবিন, লাউ, শিম, পেঁপে, কুল (আপেলকুল)-এর জাতসমূহ দেশের কৃষি উৎপাদনে অসামান্য অবদান রাখছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির মধ্যেও গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিম, চেরি টম্যাটো, সয়াবিন, ফুলসহ অন্যান্য ফসলের ১৪টি জাত কৃষকের চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে।

আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে ১৯৮৫ সালে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার (ইপসা) প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ত্রিপক্ষীয় আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৯১ থেকে দেশে উচ্চতর কৃষিশিক্ষায় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রতিষ্ঠানটি এদেশে সর্বপ্রথম ট্রাইমিস্টার নর্থ-আমেরিকান কোর্স ক্রেডিট শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রবর্তন করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত (করোনা সময় ব্যতীত) এক দিনের জন্যও কোনো সেশন জট নেই।

স্বাতন্ত্র্য শিক্ষাদান বৈশিষ্ট্য ও ফলপ্রসূ প্রায়োগিক গবেষণার জন্য অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে-বিদেশে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ও প্রতিষ্ঠানটি দেশে উচ্চতর কৃষি শিক্ষায় এক অনন্য উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। কৃষিক্ষেত্রে অল্প সময়েই তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখায় কৃষিদরদি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে ইপসার দ্বিতীয় সমাবর্তনে (১৯ জুন ১৯৯৭ অনুষ্ঠিত) প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময় ১৯৯৮ সালের ২২ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) আইন গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে দেশের ১৩তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে (১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইপসা এবং ১৯৯৮ সালে জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত) এ বিশ্ববিদ্যালয়টি কৃষিতে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় অগ্রাধিকার প্রদান করে আসছে। এ ব্যাপারে সরকারের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

২০১৭ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে বিদেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে ৫৭ (সাতান্ন) জন বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। মৌলিক গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে সম্মানজনক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কার অর্জন করে। ২০১৫ সালে বৃক্ষরোপণ ও কৃষি বনায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০১৪। ২০২১ সালে বিশ্বখ্যাত স্কোপাস ও সিমাগো ইনডেক্স জরিপে বশেমুরকৃবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে পিছনে ফেলে গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক অবস্থান এই তিন সূচকে প্রথম স্থান লাভ করে।

বর্তমানে কাপাসিয়ার টোক গ্রামে কৃষক পর্যায়ে আদর্শ প্রযুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহের সম্প্রসারণ করে চলেছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে এ সপ্তাহেই গাজীপুরের কাউলতিয়া ইউনিয়নে নতুন একটি প্রযুক্তি ভিলেজ উদ্বোধন করা হয়েছে। তাছাড়া ভেটেরিনারি টিচিং হাসপাতালের মাধ্যমে গাজীপুর জেলাসহ আশপাশের এলাকায় প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু করেছে। সম্প্রতি কানাডাস্থ সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থাসমূহের মধ্যে উন্নততর গবেষণার জন্য বিশেষায়িত সংস্থা ‘বঙ্গবন্ধু-পিয়েরে ট্রুডু এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য আমরা সবার দোয়া ও সহযোগিতা প্রত্যাশী।

লেখক: উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ