এই নির্বাচন রাজনীতিতে যে প্রভাব ফেলতে পারে

এম সাখাওয়াত হোসেন
সোমবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৪, ৩:০৪ অপরাহ্ন

৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র যে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সে কথা সর্বজনবিদিত।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৯৯ সালে তাঁর লেখা ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম বইয়ে লিখেছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন; বৈষম্য ও গোত্রে গোত্রে সংঘাত এড়ানো এবং দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর জন্য কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক। তিনি লিখেছেন, গণতন্ত্রে ঘাটতি রেখে দেশের টেকসই উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে জরুরি উপাদান হলো বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনগৃহীত নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন। অথচ বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আমরা যতগুলো নির্বাচন দেখেছি, তার মধ্যে হাতে গোনা দু–একটি ছাড়া বাকিগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও অগ্রহণযোগ্য।

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারগুলোকে আর যা-ই হোক, সেগুলোকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াসম্মত সরকার বলা যাবে না। ব্যাপক জনসমর্থন থাকা কয়েকটি দল ১৯৯০ সালে দেশে গণতন্ত্র, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার আশায় গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে সে আশা ভঙ্গ হয়েছে।

একতরফা নির্বাচনের ১০ বিপদ

২০১৪ এবং তারপর ২০১৮ সালের দুটি নির্বাচন যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক ছিল না, তা নতুন করে বলার বিষয় নয়।

এ দুটি নির্বাচন বাংলাদেশের মতো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক দেশের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। ২০১৪ সালের নির্বাচন ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ বলে চিহ্নিত হয়ে আছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনপ্রক্রিয়া যে গণতান্ত্রিক বিশ্বে এক নতুন ধারার কথিত নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে, তা আজ সর্বজনবিদিত। সেটি কী ধরনের নির্বাচন ছিল, তা এখন সরকারি দলের নেতারা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধানসহ সদস্যরাও অকপটে বলছেন। এমনকি একজন (প্রয়াত) নির্বাচন কমিশনার সে কথা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। কিন্তু বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে।

২০১৮ সালের নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সেই নির্বাচনকেই প্রকৃত অর্থে দলীয় সরকারে অধীনে নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিকাশের জন্য। কিন্তু তেমনটি হয়নি।

এবারের নির্বাচন দেশে রাজনীতি ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য বিপৎসংকেত হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে। বহু ছোট দল, বিশেষ করে আলোচিত শরিক দলগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, দুর্বল অথবা বিলুপ্ত হতে পারে তৃতীয় বৃহত্তর দল হিসেবে বিবেচিত জাতীয় পার্টি, যার লক্ষণ দৃশ্যমান। সরকারি দলের অনেক মনোনীত প্রার্থী, যাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁদের অনেকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটতে পারে তাঁদেরই সতীর্থদের হাতে।

কাজেই পরপর দুটি নির্বাচন বহুলাংশে জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় প্রকৃত গণতন্ত্রের বলয় দারুণভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এই দুই নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষি বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনের নিরপেক্ষ ক্ষেত্র তৈরির দাবি করেছিল। ক্রমেই সে দাবি বেশ জোরালো হচ্ছিল। এর জের ধরে দেশে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষ থেকে চাপ ছিল।

কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২০-২৫ দিন আগেই বিরোধী দল ও সমমনাদের মধ্যে গ্রেপ্তার–আতঙ্ক তৈরি হয়। সরকার গোলযোগ ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করার অভিযোগে গণহারে বিরোধী নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার অনেকের বিচার ও সাজা হয়েছে। এ কারণে আজকের নির্বাচনও অন্য ধাঁচে আগের নির্বাচনের মতোই হবে বলে ধরে নেওয়া যায়।

সরকার নিজের উদ্ভাবিত সংজ্ঞায় একটি কথিত সর্বজনীন বা ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। সরকারি দলের সংজ্ঞামতে, বৃহৎসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে এলে ও ভোট দিলে সংখ্যার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ নির্ধারিত হবে। বিশ্বে প্রচলিত ও গবেষণালব্ধ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের যত সংজ্ঞা আছে, তার সঙ্গে অবশ্য এটি মেলে না।

লেখক

নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


আরো সংবাদ
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com