নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
১২ অগাস্ট ২০২২, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

আগামী দিনের শিক্ষার লক্ষ্য হোক বিজ্ঞান ও ধর্মবোধের সমন্বয়ে জীবন দর্শন গড়ে তোলা

শেখ বিবি কাউছার
মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন

গত পর্বগুলোতে দেশের বাইরের বেশ ক’জন বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে কথা বলেছিলাম কিন্তু আজ যার কথা বলব তিনি আমাদের দেশের একজন অনেক বড় মাপের দার্শনিক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব।

বর্তমান সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, বহুবাদের সঙ্গে সহাবস্থান এবং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর মানবিকতার দর্শন দিক নির্দেশনা দিতে পারে।

গোবিন্দচন্দ্র  দেব এই নামের চেয়ে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন জি সি দেব নামে।জন্ম সিলেটে ১৯০৭ সালে।ছোটবেলাতেই তিনি তাঁর বাবা-মাকে হারান।তাই লেখাপড়া করার সবটুকু চেষ্টায় তাঁকে করতে হয়েছে নিজে থেকে। পড়াশোনা করতে গিয়ে ভারতীয় আধ্যাত্মতাবাদ, গ্রিক দর্শন,বৌদ্ধ দর্শন,ইসলাম ধর্ম এবং খ্রীস্টধর্মের মূলবাণী জানার চেষ্টা করেন।

তাঁর লেখা বই ‘আমার জীবনদর্শন’ থেকে কিছু উক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম যা বর্তমান সময়ের জন্য  অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে আমার মনে হল :

বিজ্ঞানের  অফুরন্ত শক্তি ও মহিমা অনস্বীকার্য। বিজ্ঞান শুধু দূরকেই নিকট করেনি,আমাদের পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে সৌরলোকের অন্যান্য প্রদেশেও গমনাগমনের রাস্তা খুলে দিয়েছে।মানুষের জীবনকে বিজ্ঞান নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বিজ্ঞানের বদৌলতে সুখে-স্বাচ্ছন্দে পরিমিত শ্রমে সব মানুষের সুদীর্ঘ জীবন যাত্রার সম্ভাবনাও আজ প্রচুর। তবুও এত সংঘর্ষ,এত অশান্তি। তবু এমন পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ। তার কারণ, বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে আয়ত্তে আনার মতো মানসিক সংযম মানুষের নেই। বিজ্ঞানের অফুরন্ত শক্তির সঙ্গে অধ্যাত্মবাদের এই অফুরন্ত প্রেমের সামঞ্জস্য ও সংযোগ স্থাপনের উপরই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।

তাই বর্তমান এই মহাসংকট থেকে মানুষকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন আজকের দিনের শিক্ষা -পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন। চাই বিজ্ঞানের সাথে মানবিকতার যোগ। সেজন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানুষকে শুধু কারিগরি শিক্ষা দিলেই চলবে না,হৃদয়ের শিক্ষা দিয়ে তার ভিতর প্রেম ও মানবিকতার প্রেরণাও জাগাতে হবে। সব ধর্মের কথা একটাই তা হলোঃ  ‘ঐক্যের বার্তা’। মানুষের আধ্যাত্মিক ঐক্য ও বৈজ্ঞানিক কর্ম- প্রেরণা মানুষকে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ধ্বংসের পথে না নিয়ে সমাজ- সংহতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাহলেই মানুষের মাঝে আবার ফিরে আসবে পারস্পরিক সমঝোতা ও প্রেম।

নিকট অতীতে হৃদয়কে বাদ দিয়ে মানুষ ছুটে ছিল বুদ্ধির পেছনে, আর আজ বুদ্ধিকে সামনে দাঁড় করিয়ে সে চলেছে কর্মব্যস্ততার সীমাহীন পথে।তাই হৃদয়হীন, অনুরাগ- বর্জিত জটিল কর্মব্যস্ততাই আজকের দিনের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজনীতি,সংস্কৃতি সবই মানুষের জীবনকে জটিলই করে তুলেছে। এগুলো মানুষকে সত্যিকার শান্তি ও সুখের সন্ধান দিতে পারে নি।বিজ্ঞানের অপূর্ব প্রাচুর্যের ভিতরও তাই সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে ব্যাপক অশান্তি এবং বিশৃঙ্খলা। তবে আশার কথা অনেকেই এই কঠিন সময়ের মধ্যেও হৃদয়ের বাণীতে আলোর সংকেত পাচ্ছেন।

জি সি দেবের ব্যক্তি জীবন

তিনি চিরকুমার  ছিলেন এবং এক হিন্দু ছেলেকে এবং এক মুসলিম মেয়েকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এবং নিজের সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক এ দুইজনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেন।এবং বাকি অর্ধেক সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন। শর্ত দেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দর্শন প্রচার করবে।১৯৮০ সালে এই অর্থ দিয়ে ‘গোবিন্দ দেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্র ‘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

প্রতিদিন সকালবেলা উঠে তিনি গীতা,বাইবেল, কোরআন পড়তেন।তারপর ধ্যানে বসতেন এবং মৌনতা পালন করতেন। পূজামন্ডপে যেমন উপস্থিতি ছিল তাঁর তেমনি ছিল কোন মিলাদ -মাহফিল,কি ঈদ উৎসবেও।বৌদ্ধ পূর্ণিমার অনুষ্ঠানে যেমন যেতেন ঠিক তেমনি জানাজার কাতারে দাঁড়াতেও কোন দ্বিধা ছিল না তাঁর। অল পাকিস্তান ফিলোসোফিকেল কংগ্রেসের সভাপতি হয়েও চলাফেরাটা ছিল খুবই সাধারণ।তিনি যে আগাগোড়া একজন ভালো মানুষ ছিলেন, সেটা তাঁর সম্পর্কে না পড়লে বুঝানো যাবে না।  সেই সময় তিনি শুধু বাঙালি দার্শনিকদের মধ্যেই সেরা ছিলেন না, ছিলেন সমগ্র পাকিস্তানে সেরা।

পাকিস্তানি হানাদারদের মূল লক্ষ্য ছিল আমাদেরকে মেধাশূন্য করে ফেলা।জি সি দেবকেও তারা অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে সেই ২৫ মার্চ রাতে। তাঁর সত্য কথন,সততা,মানবিকতা এবং দর্শনের জন্যে তাঁকে ব্রাশফায়ারে ছিন্নভিন্ন করা হয়।

মুসলিম দর্শনের উপর এত বড় পন্ডিত এর আগেও কেউ আসে নি এবং তারপরেও কেউ এত গভীর পান্ডিত্য অর্জন করেন নি।

তাঁর এই নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড আমাদেরকে ইতিহাসের আরো দুজন দার্শনিককে স্মরণ করিয়ে দেয়।

একজন হলেন সক্রেটিস। তাঁকেও হেমলক পানে মারা যেতে বাধ্য করা হয়। আরেকজন হলেন ইমাম আবু হানিফা।যার গলায় জোর করে বিষ ঢেলে দেয়া হয়। কারণ উনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে পানির পাত্র তাঁকে দেয়া হচ্ছে এই পাত্রে বিষ আছে।

আসলে সক্রেটিস,  ইমাম আবু হানিফা যেভাবে অমর, জি সি দেবও অমর হয়ে থাকবেন আমাদের মাঝে।

আসলে সত্যের কখনো মৃত্যু হয় না, ধর্মের কখনো মৃত্যু হয় না।

এখন বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী  শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দিতে হবে সুফিবাদ সম্পর্কিত শিক্ষা। কারণ যুক্তি,বিশ্বাস, সদাচার ও ধর্মাচারের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই। আমাদের পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআনও একসঙ্গে যুক্তি, সদাচার ও অনুভূতিকে সমর্থন করে।

শুধুমাত্র বস্তুবাদী বা বিজ্ঞান শিক্ষা মানুষকে শান্তির দিশা দিতে পারছে না,পারছে না সুখের দিশা দিতে। যেমন,সম্প্রতি আমেরিকাতে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে কার বই জানেন? হ্যা, জালালুদ্দিন রুমির বই। যারা শান্তির খোঁজ করছে তাদের প্রিয় নাম এখন জালালুদ্দিন রুমি। কারণ বিজ্ঞান বা বস্তু তাদেরকে শান্তি দিতে পারছে না,পণ্যও দিতে পারছে না শান্তি।

জি সি দেব বলেছেন,”যে জ্ঞান জগতের পেছনের তত্ত্বের দিকে নিয়ে যায় না,সেই জ্ঞান দ্বারা মানুষের সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। ” আমরা এখন যে বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছি বা বাস্তবতার কথা বলছি তিনি এখন থেকে ৬০ বছর আগে এই কথাগুলো বলে গেছেন।কারণ তিনি একজন ক্ষণজন্মা দার্শনিক ছিলেন।

পৃথিবী এখন আমাদের হাতের মুঠোয়,কিন্তু বড়ই আশঙ্কার কথা, বিশ্বাস ও কর্মপ্রেরণা নিয়ে। তাইতো জি সি দেব বলেছেন, ” এজন্যে চাই বিজ্ঞানের সাথে ধর্মবোধের মিলন। যার মূল কথা বিশ্বের ঐক্য, মানুষের ঐক্য।” এই একত্ববোধে জাগিয়ে তুলতে না পারলে শুধু বিজ্ঞানের জ্ঞান মানুষকে ব্যাপক ধ্বংসের পথেই নিয়ে যাবে।

আসুন আমরা শিক্ষকরা , যে দেশের সন্তান,যে দেশের মানুষের জন্যে,আমাদের কল্যাণের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছেন সেই দেশের মানুষ হয়ে তাঁর সততা,

মানবিকতা, দার্শনিক নীতিবোধ,

অসাম্প্রদায়িক চেতনা   নিজেরা মনে  ধারণ করে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের মাঝে।

কারণ আমরা মানুষ গড়ার কারিগর। আমরা জানলেই জানবে আগামী প্রজন্ম,আমরা শিখলেই শিখবে আগামী প্রজন্ম।

 

লেখক : প্রভাষক

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ

নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


আরো সংবাদ