ব্রেকিং নিউজ
সংবাদকর্মী আবশ্যক। আগ্রহীগণ সিভি, ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ আবেদন করুন - onnodristynews@gmail.com/ news@onnodristy.com. মুঠোফোন : ০১৯১১২২০৪৪০/ ০১৭১০২২০৪৪০।

নান্দনিক ঝিনাইদহ, দর্শনীয় স্থানগুলো দর্শকশূন্য কেন! (চতুর্থ খন্ড)

মোঃ সবুর মিয়া।।

ঐতিহ্যবাহী হাজার বছরের ইতিহাসের অলংকৃত এক নাম ঝিনাইদহ। অতি পরিতাপের বিষয় ঝিনাইদহের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঐতিহ্যবাহী স্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের ধারণা খুবই কম। ঝিনাইদহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থান ও বিশ্বখ্যাত মানুষ । ধারাবাহিক আলোচনা আজ জামাল নজরুল ইসলামঃ

জামাল নজরুল ইসলাম ঝিনাইদহ:

১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলাই জামাল নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্ববাসী কিংবা বাংলাদেশ জানতো না, একজন মহান ব্যক্তি জন্ম নিয়েছেন ঝিনাইদহে । জামাল নজরুল ইসলামের বাবা চাকুরী করতেন কলকাতাই। সেই সময় ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হয়নি। জামাল নজরুলের ছেলেবেলা কাটে কলকাতাতেই।৪র্থ শ্রেণী সম্পন্ন করে তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে চলে আসেন ও পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। তবে এখানে একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি চমৎকার কৃতিত্ব দেখান। ফলে “ডাবল প্রমোশন” পেয়ে সরাসরি ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত এই স্কুলে পড়ালেখা করলেও পশ্চিম পাকিস্তানের লরেন্স কলেজ থেকে ও’লেভেল এবং এ’লেভেল পাস করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএসসি অনার্স শেষ করেন। এরপর ১৯৫৭ সালে তিনি কেমব্রিজে পড়তে যান এবং ১৯৫৯ সালে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬০ সালে সম্পন্ন করেন মাস্টার্স। কেমব্রিজে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে। আবার কেমব্রিজে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই “ডক্টর অব সায়েন্স” ডিগ্রি অর্জন করেন।

>>১৯৭১ সাল বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তখন তিনি দেশে ছিলেন না কিন্তু তাই বলে দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা কমেনি।তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যুদ্ধের বিস্তারিত জানিয়ে চিঠি লিখলেন। যুদ্ধ বন্ধে সহায়তা করতে অনুরোধ করলেন।

চট্টগ্রামে পাহাড় ধ্বসে মানুষ মারা গিয়েছিলো। জামাল নজরুল ইসলাম বসে থাকেন নি। তিনি তাঁর সাধ্যমত সাহায্য করেছিলেন হতাহতের পরিবারকে।

>> ২০০১ সালে গুজব রটে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে তাড়াতাড়িই। কারণ হিসেবে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো জানায়, সৌরজগতের গ্রহগুলো এক সরলরেখা বরাবর চলে আসবে তাই! সে সময় জামাল নজরুল ইসলাম হিসাব কষে দেখিয়েছিলেন, আপাতত পৃথিবী ধ্বংসের কোনো লক্ষণ নেই। আর গ্রহগুলোর সরলরেখার সাথে পৃথিবী ধ্বংসের কোনো সম্পর্ক নেই।

জামাল নজরুল ইসলাম বিজ্ঞানী হলেও তিনি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় ছিলেন অগ্রপথিক। ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ ছাড়াও ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ নামে তাঁর আরেকটি বই আছে। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিখেছেন। কবিতা পছন্দ করতেন। প্রায়ই তাঁর বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কবিতার “উদ্ধৃতি” থাকতো। জামাল নজরুল ইসলাম নিজেই পিয়ানো বাজাতেন। সার্সন রোডের বাসায় মাঝে মাঝে আসর জমতো। ডকুমেন্টারি দেখানো হতো।

জামাল নজরুল ইসলাম তার ছাত্রজীবন ও কর্মজীবনে বেশ কিছু বিজ্ঞানীর সাথে দিন যাপনের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। বর্তমান সময়ের আলোচিত বিজ্ঞানী “স্টিফেন হকিং”-এর বন্ধু ও রুমমেট ছিলেন আমাদের দেশের “ঝিনাইদহের” এই কৃতি সন্তান। ভারতের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জয়ন্ত নারলিকা ছিলেন ওনার সহপাঠী। তাঁর বন্ধু ছিলেন নোবেল জয়ী ব্রায়েন জোসেফসন, আব্দুস সালাম, রিচার্ড ফাইনম্যানের মত বিজ্ঞানীরা। রিচার্ড ফাইনম্যানের সাথে তাঁর ছিলো খুব ভালো সম্পর্ক। তাঁকে একটা মেক্সিকান নকশী কাঁথা উপহার দিয়েছিলেন ফাইনম্যান।

১৯৬৩-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে পোস্ট ডক্টোরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত কেম্ব্রিজের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমিতে কাজ করেন।মাঝে ১৯৬৮-তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্ট্যাডিতে ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭১ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভিজিটিং সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭২-এ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন গবেষণা সহযোগী হিসেবে। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে ফলিত গণিতের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় আবারো তিনি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্ট্যাডিতে ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭৫-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলে ফেলো ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিলেও পরে রিডার পদে উন্নীত হন। ১৯৮৪ পর্যন্ত এখানেই কর্মরত ছিলেন। এসময় তিনি ৩য় বারের মত ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্ট্যাডিতে ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

>>১৯৭৭ সালে ডঃ জামাল নজরুল ইসলামের একটি গবেষণার (Possible Ultimate Fate of the Universe) ড্রাফ্‌ট থেকে বড় বড় বিজ্ঞানীরা উৎসাহিত হয়েছিলেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে। ডঃ জামাল নজরুল ইসলামের অবদানের কথা স্বীকার করে বিখ্যাত পদার্থবিদ এবং গণিতজ্ঞ ফ্রিম্যান ডাইসন বলেন,”

“We are particularly indebted to Jamal Islam, a physicist colleague now living in Bangladesh. For an early draft of his 1977 paper which started us thinking about the remote future.”

 

বিজ্ঞানের জগতে ডঃ জামাল নজরুল ইসলামের অবদান কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী ডঃ আব্দুস সালামের কথায়ই বোঝা যায়। তিনি বলেছিলেন,

“এশিয়ার মধ্যে আমার পরে যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পায়, তবে সে হবে ডঃ প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম।

মাতৃভূমির টানে ডঃ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৮৪ সালে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল এন্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলা আধুনিক গবেষণাগারটিই সম্ভবত তাঁর জীবনের বড় অবদান।

তিনি মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি, রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি, কেমব্রিজ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের সদস্য ছিলেন তিনি।বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ডঃ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম অনেক উৎসাহ জুগিয়েছেন।

“অনেকের ধারণা, ভালো ইংরেজি না জানলে বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে না। এটা ভুল ধারণা। মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা হতে পারে,এমনকি উচ্চতর গবেষণা হতে পারে।

ডঃ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের রচিত গ্রন্থসমুহ:

(১) দ্যা আলটিমেট ফেইট অব দ্যা ইউনিভার্স (১৯৮৪) (২) ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪) (৩) রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪)   (৪)অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি(১৯৯২)(৫) স্কাই অ্যান টেলিস্কোপ (৬) দ্যা ফার ফিউচার অব দ্যা ইউনিভার্স (স্প্যনিশ ভাষায় অনূদিত)    (৭) কৃষ্ণবিবর(৮) মাতৃভাষা ও বিজ্ঞানচর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ(৯) শিল্পসাহিত্য ও সমাজ

পুরষ্কার:

বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী থেকে ১৯৮৫ সালে জামাল নজরুল ইসলামকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল পান।১৯৯৮ সালে ইতালির আব্দুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাঁকে মেডাল লেকচার পদক দেওয়া হয়। তিনি ২০০০ সালে কাজী মাহবুবুল্লাহ ও জেবুন্নেছা পদক পান। ২০০১ সালে লাভ করেন একুশে পদক। ২০১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক পান।

ফুসফুস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধ্যাপক ডঃ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

ডঃ জামাল নজরুল ইসলাম এমন একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী,সাহিত্য ও শিল্পমনা শুধু ঝিনাইদহ বাসী নয় সমগ্র বাংলাদেশ, তথা সমগ্র বিশ্বের অহংকারের প্রতীক। ঝিনাইদহের মানুষ হিসেবে আমরা তাকে সম্মানের আসনে বসাতে ব্যর্থ হয়েছি। উদ্যোগ নিলে ঝিনাইদহে ডক্টর জামাল নজরুল ইসলাম গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকরণের মাধ্যমে, ডক্টর জামাল নজরুল ইসলামের গবেষণালব্ধ বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারি।

 

 

Facebook Comments


Leave a Reply

শিরোনাম
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাড়ীঘর ভাংচুর ও আমেরিকান নাগরিক সহ-৯ জন জখম কোটচাঁদপুরে পানিতে বন্দি ৬টি অসহায়  পরিবার, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা স্যার নিজেই ড্রাইভার! কুষ্টিয়ায় নি‌খোঁজের ১৮ ঘন্টা পর নদী‌তে ভে‌সে উঠ‌লো ব্যাংক কর্মকর্তার মৃত‌দেহ হরিণাকুণ্ডুর পল্লিতে এক গৃহবধুর আত্মহত্যা জাতীয় পরামর্শক কমিটি সতর্ক করল করোনা নিয়ে ! বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ সক্ষম : পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিয়াঙ্কার ‘বেওয়াচ’ ভালো লাগেনি পামেলার আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গের পাশে শাহরুখ শর্তসাপেক্ষে সবকিছু খুলছে নওগাঁয় চেম্বারের উদ্যোগে মাসব্যাপী ডেঙ্গু ও মসক নিধন শুরু মোংলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘর বরাদ্দ, বিতরণ করা হয়েছে জিআর চাল প্রবাসী জাহিদুল ইসলাম বাহারে উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ নান্দাইলের মিতু গাইবান্ধায় শ্বশুরালয়ে হত্যার অভিযোগ কুষ্টিয়ায় ৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত  ঝিনাইদহের বিএনপি নেতা ওহীদ চেয়ারম্যান এর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত কুষ্টিয়ায় নদীতে গোসল করতে নেমে ব্যাংকার নিখোঁজ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে দুটি গরুর মৃত্যু করোনা ভাইরাস রোধে ১৫ জুন পর্যন্ত যেসব শর্ত মানতে হবে ইরফান-ঈষাণার ‘প্রবঞ্চনা’ গণপরিবহন চালুর বিষয়ে সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে : সেতুমন্ত্রী নোয়াখালীতে নতুন ২৯ জনের করোনা শনাক্ত, জেলায় মোট আক্রান্ত-৪৫৬জন অপূর্ব-মেহজাবিনের বিয়ে শুক্রবার! ২৪ ঘন্টায় দেশে একদিনে রেকর্ড শনাক্ত ২০২৯,আরও ১৫ জনের প্রাণহানি পোরশায় নিরাপদ আম সংগ্রহের শুভ উদ্বোধন

© All rights reserved © 2017 onnodristy.com

Theme Download From ThemesBazar.Com