১৮ অগাস্ট ২০১৮ || শনিবার || ০৪:১১ অপরাহ্ন

বেসরকারি শিক্ষকদের ঈদ উৎসব।

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম।।
উৎসব সার্বজনীন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ঈদ উপলক্ষে বোনাস মূল বেতনের ২৫ শতাংশ প্রদান করা হয়। এতে ১৬ হাজার টাকা স্কেলের একজন শিক্ষকের বোনাস ৪ হাজার টাকা। এই যৎসামান্য অর্থে একটি পরিবারের ঈদ উৎসব কতটা দুরূহ ব্যাপার তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া  ৫’শ টাকা চিকিৎসা ভাতা, বাড়ি ভাড়া ১ হাজার টাকা দেয়া হয়। মাসিক বেতন ভাতার পরিবর্তে দেওয়া হয় অনুদান সহায়তা। সরকারি বেসরকারি বৈষম্য বিলোপ সাধনে, এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের দাবি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ। এ দাবি শিক্ষক শিক্ষার্থী, অভিভাবক সহ সকলের। সকল দলমতের মতের শিক্ষক সংগঠনগুলোর ও মূল দাবি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ।
শিক্ষাকে বেসরকারিকরণ করে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছামত শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বেতন ও চাঁদা আদায় করে থাকে। তাতে করে প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ব‍্যয়ভার নির্বাহ করতে পারেন না, ফলে শিক্ষা বঞ্চিত হচ্ছে ও ঝরে পড়ছে লক্ষ শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব‍্যবস্থাপনায় ও বিভিন্ন অসংগতি রয়েছে। শিক্ষা পণ্য নয়, শিক্ষা সেবা এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারও বটে। সময়ের দাবি মানোন্নত শিক্ষা ও ঝরেপড়া রোধে এখনই শিক্ষার সার্বিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
দীর্ঘদিনের পুরাতন শিক্ষক সংগঠনগুলো শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্য দূরীকরণে দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। সংগঠনগুলো বেসরকারি শিক্ষকদের ন‍্যায়সংগত যৌক্তিক অধিকারের দাবি দাওয়া আদায়ের বিষয়ে যেমনি উদাসীন তেমনি নিরুৎসাহিত। শিক্ষক নেতারা এখন নিজ নিজ সংগঠনের ও পদ পদবি নিয়েই ব্যস্ত। তারা  শিক্ষকদের স্বার্থের বিষয়ে আগের মতো গুরুত্ব দেন না। সরকারের আমলারা যেসব তথ্য দিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করেন, তার বিপরীতে সঠিক তথ্য-উপাত্ত শিক্ষক নেতারাও দিতে পারেন না। তাই শিক্ষকদের ন্যায্য দাবিও নীতিনির্ধারকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে মেনে নেয় না। শিক্ষক সংগঠনগুলোর ৯০% নেতারা অবসরপ্রাপ্ত ও অশিক্ষক। শিক্ষকদের দাবিদাওয়ায় নেতৃবৃন্দের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা না থাকায় স্বভাবতই নিস্ক্রিয় থাকেন। এ সব কারণেই শিক্ষকদের আন্দোলন এখন শিক্ষকদের স্বার্থের চেয়ে নেতাদের পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি এবং দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
দেশে শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭ শতাংশ পরিচালিত হয়ে থাকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। মাত্র তিন শতাংশ  শিক্ষা পরিচালনা করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি নিয়মানুসারে সকল সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। অপরদিকে বেসরকারি শিক্ষকদেরকে সরকারি অন‍্যান‍্য ভাতা বিহীন মূল বেতন পেয়ে থাকেন। দেশে এমপিও শিক্ষক সংখ্যা হচ্ছে প্রায় পৌনে পাঁচ লক্ষাধিক। এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষকেরা নাম মাত্র বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন, যা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করা খুবই কষ্টকর। অথচ বেসরকারি শিক্ষকেরাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছেন।
শিক্ষার মান বিচারে সব ক’টি সূচকের বিবেচনায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই শীর্ষে। পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, শিক্ষার্থীদের সংখ্যা, জিপিএ-এর মান, পাসের হার সব  দিকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ছাপিয়ে সরকারি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা কখনোই শীর্ষে যেতে পারেনি। অথচ সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা সব সময়ই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে আকাশ-পাতাল বেতন-ভাতার বৈষম্য রেখে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সরকারকেই এ বৈষম্যের অবসানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে জাতীয়করণে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য বিভাজন সৃষ্টি করে কখনোই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হবে না। আর সময় নষ্ট না করে শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করে শিক্ষার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
শিক্ষায় এখন যে নৈরাজ্য চলছে, তা দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা তো দূরের কথা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাই দুরূহ হয়ে পড়ছে। শিক্ষায় বৈষম্য সৃষ্টি এবং শিক্ষকদের সঙ্গে বিমাতাসূলভ আচরণ করছে সরকার। শিক্ষকদের বঞ্চিত করে, কখনোই মানসম্পন্ন শিক্ষা আশা করাটাই দূরাশা। দেশের সকল স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট নীতিমালা বিহীন বিচ্ছিন্নভাবে সরকারিকরণের ফলে বৈষম্য আরো প্রকট হচ্ছে। অগ্রাধিকার পাবে এমন যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে জাতীয়করণ করার ফলে, সরকারের বিরুদ্ধে শুধু শিক্ষকেরাই নয়, সংশ্লিষ্ট এলকার জনগণও ক্ষুব্ধ হচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা, পূর্ণাঙ্গ বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার দাবি দীর্ঘ দিনের। পবিত্র ঈদ উৎসব সবার, শুধু সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদেরই নয়। সরকারি বেসরকারি সকল বিধিবিধান, কর্ম ঘন্টা, পাঠ‍্যপুস্তক, পাঠ‍্যক্রম, পাঠ‍্যসূচী ও পরীক্ষা পদ্ধতি একই। অথচ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত করে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছ। বেসরকারি শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতাসহ অন‍্যান‍্য সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত করে সরকার বেসরকারি শিক্ষকদের সাথে চরম বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ বর্তমান সরকারের ১০ বছরের সময়ে বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য নিরসনের অবদান তো নেইই , তদুপরি বৈষম্য আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমি মনে করি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়েছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরামের পক্ষ থেকে বেসরকারি শিক্ষকদের সকল বৈষম্য দূরীকরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও পূর্নাঙ্গ উৎসব ভাতা প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।
।। শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণই হতে পারে একমাত্র সমাধান।।
-লেখক
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।
Facebook Comments


© All rights reserved © 2017 Onnodristy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com