ব্রেকিং নিউজ
সংবাদকর্মী আবশ্যক। আগ্রহীগণ সিভি, ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ আবেদন করুন - onnodristynews@gmail.com/ news@onnodristy.com. মুঠোফোন : ০১৯১১২২০৪৪০/ ০১৭১০২২০৪৪০।

ভিকারুন্নেসার ছাত্রী অরিত্রীর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? আছে নানান কারণ … শিক্ষাপদ্ধতিও বেঁধে যায়।

মোঃ মমিনুল ইসলাম।।

প্রথমেই অরিত্রীর অকাল মৃত্যুর জন্য গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এন্ড্রয়েট সেল ফোন ব্যবহার করা উচিৎ নয়।এই বয়সে ব্যক্তিগত কোনো সেল ফোনই তাদের ব্যবহার করাকে আমি সমর্থন দিব না।অরিত্রীর মৃত্যুর পেছনে শুধু ঐ শিক্ষিকা দায়ী নয় বলে আমার মনে হয়।শিক্ষার্থীদের এসব বিষয় বুঝাই।তারাও আমার যুক্তিকে সমর্থন করে।আমিও তাঁদের শাসন করি।আবার ভালোবাসা দিয়েই তাদের মন জয় করি।তারা আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে।আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার মাঝে শাসন থাকতেই হবে।তবে যখন শাসন করব তখন অন্য সহকর্মীকেও বলব তাদের একটু ভালোবাসতে।কাউকে যদি একটু বেশি শাসন করে থাকি এবং বুঝতে পারি যে তার মনটা দুর্বল হয়ে পড়ছে তবে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর- স্নেহ – ভালোবাসা দিলেই তারা বুঝতে পারে শিক্ষক তাদের ভালোর জন্য শাসন করেন এবং ভালোবাসেন।সুতরাং শাসন করাকে আমি আগ্রাধিকার দিব।ধরণটা অবশ্য একটু নমণীয়, সহণীয় বা ভিন্ন ধরণের হতে পারে।

এবার আসছি মূল আলোচনায়।অরিত্রীর পরীক্ষা চলাকালীন কর্তব্যরত শিক্ষিকা তার নকল ধরেন।পর্যায়ক্রমে সহকারি প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ পর্যন্ত বিষয়টি পৌঁছে যায়।স্বাভাবিকভাবেই স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।তার মোবাইলে মূল বইয়ের পৃষ্ঠাও কপি করা ছিলো।এটা চরম অন্যায়।তবুও বলব অধ্যক্ষ পর্যন্ত যাওয়ার পরে অভিভাবক ক্ষমা প্রার্থনা করার পরেও বিষয়টি নিয়ে এত বাড়াবাড়ি না করলেই চলত।কারণ বিষয়টি স্পর্শকাতর।ভিকারুন্নেসা স্কুল এণ্ড কলেজের মত বিদ্যাপিঠেও নকলের মত ঘটনা ঘটেছে।তাও আবার সৃজনশীলের এই যুগে।বিষয়টি খুবই ভাবনার।সুতরাং স্কুল প্রশাসনকে গভীরভাবে ভাবনার প্রয়োজন ছিলো।তার মানসিক অবস্থা জানার দরকার ছিলো।ঠিক যেমন রিমান্ডে সব জানতে চাওয়া হয়, তেমনিভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করারও দরকার ছিলো বলে আমি মনে করি।তার সেল ফোন সার্চ করলেই জানা যেত নকলের পেছনে কী কী দূর্বলতা কাজ করেছে।পরীক্ষার প্রস্তুতি কেন খারাপ হলো?নকলের মত এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়টি সে কেন বেঁছে নিল? সেই রাতে বাসায় কোনো সমস্যা হয়েছিলো কিনা।

অভিভাবককে ডেকে ছাত্রীর সামনে অপমান করায় সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।এটা স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেনে নেওয়া খুবই কঠিন।সেই অবস্থায় প্রশাসন কেন সেই অভিভাবকেরও সেইই ছাত্রীকে নকল করার অপরাধে রাগের মাথায় অনেক কিছুই বলার ছিলো এবং এটা স্বাভাবিক বিষয়।পরে সেই অভিভাবক বাসায় যাওয়ার পরে তার মেয়েকে বাবা-মা কাছে ডেকে নিয়ে আদর দিলেই তো বিষয়টি হালকা হয়ে যেত।প্রশাসন আঘাত করলো আবার আমিও মেয়েকে সমবেগে আঘাত করব এটা ঠিক নয়।কারণ আমি আপনি যে বাবা বা মা।বুঝানোর মত যথেষ্ঠ ধৈর্য ক্ষমতা বাবা মায়ের মাঝে থাকতেই হয়।বিশেষ করে এই বয়সের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা খুবই জরুরী।

যে রাতে মেয়েটি বাসায় ফিরলো সেই রাতে মেয়েটিকে কেন নজরে রাখা হলো না?ঐ মেয়ে সম্পর্কে বাবা মায়ের ধারণা যেমন ছিলো,স্কুল প্রশাসনের ধারণা তার চেয়ে বেশি থাকার কথা নয়।মেয়েটি যদি বেশি আদরের হয়ে থাকে তবে বাবা মায়েরই তা জানা ছিলো এবং এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের পরে রাগারাগির মত ঘটনাও যেখানে ঘটলো সেখানে কেন মেয়েটিকে সেই রাতে বাবা মা কড়া পাহারায় রাখলেন না? সেই রাতে মেয়েটিকে নিয়ে স্নেহ ভালোবাসায় ঘিরে নানান প্রশ্ন করা যেত।ভালোবাসা দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে মেয়ের আদরের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে আসল কারণটা(নকল) জানার দরকার ছিলো।কিন্তু বাস্তবে কেউই তা চেষ্টা করেনি।

মেয়েটি কোনো ছেলের সাথে সেল ফোনে কথা বলত কিনা।রাতে সে কারোর সাথে চ্যাটিং করত কিনা।সেই রাতে সে পড়েছিলো কিনা।সেই রাতে সে কার কার সাথে যোগাযোগ করেছিলো? কয়টা পর্যন্ত জেগে ছিলো? পরীক্ষায় নকল করতে হলো কেন? সৃজনশীল প্রশ্ন তো কমনই পড়ে না!তাহলে সে কেন নকল করলো? এই রকম নানান প্রশ্নই প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে।আর এটাই স্বাভাবিক।তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী কে ছিলো? তার ব্যক্তিগত কোনো বিষয় সেই বান্ধবী জানে কিনা।এগুলোও কিন্তু জানার বিষয়।সে দীর্ঘ দিন কোনো মানসিকভাবে দুর্বল ছিলো কিনা।আগের পরীক্ষাগুলো ভালো করেছে কিনা।মেয়েরা আজকাল সহজে সব খুলেও বলতে চায়।যা সে বান্ধবীকে বলে তা সে বাবা মাকেও বলতে চায় না।আর এখানে যদি সে কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে যায় তাহলে বিষয়টি আরও ঘোলাটে হবে।ধরুণ সেই রাতে কোনো ছেলের সাথে চ্যাটিং করেছে।ছেলেটির সাথে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে।তাই সে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারেনি।ফলে কপির আশ্রয় নিয়েছে।একটা কারণ তো অবশ্যই আছে। এখানে সবাই মেধাবী।তাহলে কেন সে এই আশ্রয় নিয়েছে?এই প্রশ্ন শিক্ষকরাও এড়িয়ে যেতে পারেন না।

আবার ধরুণ তার বাবা-মা বাসায় ফিরে উল্টো তাকেই মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে বা শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন।আর মেয়েটি সব মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার মত এমন একটি জঘণ্য কাজে লিপ্ত হয়েছে।সবাই জীবনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।একজন মানুষ কখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়? যখন জীবনে আর কিছুই করার থাকে না।কোনো আশা থাকে না।থাকে না জীবনের কোনোই মায়া।হয়ে পড়ে ভীষণ বিষাদগ্রস্ত!! ভীষণ আবেগী!তাহলে এসব প্রশ্ন উত্তর কী আমরা সেই শিক্ষিকার কথা দিয়েই শেষ করতে পারি।এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অন্তরালের অনেক অজানা তথ্যকেই সামনে আনতে হয়।আমি কেবলি তাদের সম্পর্কে ধারণা করছি মাত্র।

এবার আসছি শিক্ষা পদ্ধতির দিকে।দেখি এটিও পরোক্ষভাবে দায়ী কিনা।

আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতির আছে চরম বৈষম্য।শিক্ষানীতি আছে তবে তার কার্যত বাস্তবায়ণ নেই।এটি রাষ্ট্র তথা কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেননি।যেখানে একই দেশে এক শ্রেণির ধনীর দুলালীরা একই পাঠ্য বই পড়িয়ে যথেষ্ট টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অন্যদিকে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তরা হচ্ছে তাদের শিকার।তারা অনেক পিছিয়ে পড়ছে।এরপর রাজধানীসহ সারা বাংলাদেশে চলছে জিপিএ এ+ এবং গোল্ডেন ফাইভ পাওয়ার হুমরী খাওয়ার প্রতিযোগিতা।তাই ছেলেমেয়েরা যে পরিবারেই জন্মগ্রহণ করুক না একটু বোধোদয় হওয়ার পরেই বাবা মায়ের সাধ্যের বাহিরে স্বনামধন্য স্কুল কলেজে পড়ার চিন্তা করে।আবার এক শ্রেণির অভিভাবকরা ছেলেমেয়েকে নামিদামি স্কুলে বা কলেজে পড়িয়ে একে অপরে গল্পের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।আমার ছেলে অমুক স্কুলে আমার মেয়ে তমক স্কুলে পড়ে।এটাইই যেন হয়ে উঠে তাদের বড় ক্রেডিট। পিইসি ও জেএসসিতে ডাবল গোল্ডেন পেয়েছে বলতে বলতে গলা ফাটিয়ে ফেলেন নতুবা মুখে ফেনা জমিয়ে ফেলেন।আমি এসএসসি ও এইচএসসির কথা নাই বললাম।এই জিপিএ প্রতিযোগিতা ও দাম্ভীকতার গল্পের প্রতিযোগিতায় আমাদের কত সন্তানের ভবিষ্যৎ আমরা নষ্ট করে দিচ্ছি সেটা হয় তো অনেক অভিভাবকই ভাবি না।এই বয়সে পরীক্ষার ফলাফলকে এত আগ্রাধিকার দিতে হবে কেন?আমাদের দেশে আগেও তো পিইসি ও জেএসসিতে সমাপনী পরীক্ষা ছিলো না।তবে কি আগের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো মানুষ হয়নি? এগুলো তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য এবং প্রাপ্তি হিসেবে সনদ দিয়ে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন আছে ধরে নেওয়া যায় তবে আমরা বিগত বছরগুলোতে সেই জায়গাগুলো থেকে কতটা সরে এসেছি সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমাদের কাছে মুখ্য হয়েছে কিভাবে গোল্ডেন পাওয়া যায়।এই যুগে গোল্ডেন ছাড়া ভাত নাই।তাই সবাই একটু ঐতিহ্যবাহী স্কুল কলেজ গুলোতেই পড়তে বেশি পছন্দ করি এবং প্রতিকূলতা থাকলেও সেই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করাই।হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করি।আর প্রতিষ্ঠানও তার পলিচি অনুযায়ী চলতে থাকে।চলতে থাকে পড়াশোনার হাজারো বৈষম্য।একদিকে ভর্তি ফি বেশি,অন্যদিকে কঠিন শাসন।মাঝে পড়ে যায় ছাত্রছাত্রীরা।তারা বেড়োনোর পথ খুঁজে না পায়।একদিকে অভিভাবক ঠেলে প্রশাসনকে আর প্রশাসন ঠেলে অভিভাবককে।ঠেলাঠেলির এই রাজত্বে পিষ্ট হয় আমাদেরই ছেলে -মেয়ে কিন্তু আমরা তা জেনেও শিক্ষার্থীদের ফেলে দিই সেই রাজত্বের মাঝখানে।আজ অবধি এটুকুই দেখলাম।বোধোদয় হলো না আমাদের শিক্ষানীতি প্রণেতাদের।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো উপর্যপুরি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়।এখানে ছাত্রছাত্রীরা শিখতে আসে।শেখার পাশাপাশি আনন্দের জন্য রয়েছে একটি সনদ যেন তারা এটি তাদের সফলতাকে স্মৃতি করে রাখতে পারে।অবশ্য আমাদের দেশে এই সনদ বিশেষ করে জেএসসি ও এসএসসির মত জাতীয় পরীক্ষার সনদ দিয়ে সরকারি চাকরিও হয়।তাই গুরুত্ব যে কিছুই নেই তা বল যাবে না।তবে এটা আমাদেরই সৃষ্টি যা জাপান,কানাডা বা স্পেনের মত দেশেও নেইই।তাই ছাত্রছাত্রীরা নয় স্বয়ং শিক্ষক ও অভিভাবকরাই চাকরির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে ছেলেমেয়েদের এই দৌড় প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়।রয়েছে আবার প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সনদের প্রতিযোগিতা।যদি এমনটি হত যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানকে এত গুরুত্ব দিতে হবে না।এই স্তরের সকল পরীক্ষা শুধুই তাদের আনন্দ নির্ভর হবে, চাকরি নির্ভর নয়।তাহলে হোচট খাওয়া দৌড় প্রতিযোগিতাও কমে যেত।অন্যদিকে শিক্ষা জাতীয়করণ হলেও সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানের এই ভর্তি বাণিজ্য কমে আসতো।সবাই সরকারি সনদ পেত।তাই একটা স্বস্তি ফিরে আসত।সকল শিক্ষার্থীরা স্বপ্ল খরচে পড়তে পারত।শিক্ষকদের চাকরিও স্থায়ী হত।সব মিলিয়ে অনেকটাই সমতা ফিরে আসত।তাই শিক্ষার এই দিকটায় যথেষ্ঠ ঘাটতিও রয়েছে।শিক্ষার এই বৈষম্য দূর করতে পারলে আজকের এই সবুজ শ্যামল সোনার বাংলায় অনেক অরিত্রী বেঁচে যেত।সুতরাং শিক্ষা ও শিক্ষা পদ্ধতিকেও আমি দায়ী করব।

আমাদের শিক্ষানীতিতে শিক্ষক নিয়োগের দূর্বলতাও প্রকাশ পায়।নেই কোনো স্বতন্ত্র শিক্ষা সার্ভিস কমিশন।নেই কোনো স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো।নিয়োগের নেই কোনো শক্ত আইন কাঠামো।নেই শিক্ষক নিয়োগের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার যোগ্য মাপকাঠি।ফলে যত্রতত্র হর হামেশায় মিলছে শিক্ষক নিয়োগ।কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়ায় তাঁদের সরাসরি ক্লাস নিতে দেওয়া হয়।নিতে হয় না কোনো অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকের আন্ডারে টিচিং এসিস্ট্যান্টের কোনো অভিজ্ঞতা।ফলে অনেকের পাঠদানের কৌশলও ঠিকমত রপ্ত হয় না।অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের সাথে ভাষা সংযমের বিষয় হয়তোবা তাঁদের খেয়ালেও থাকে না।শিক্ষক নিয়োগের পূর্বের ধাপগুলোও খুব হালকা।শুধু লিখিত ও ভাহভা আবার অনেক ক্ষেত্রেই নামমাত্র লিখিত ও ভাইভা নিয়ে অযোগ্য শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয় যা জাতির জন্য বিভীষিকাময়।শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর।তিনিই যদি হন অযোগ্য তাহলে আলোকিত মানুষ গড়ার চেষ্টা গড়বেন কিভাবে?যারা এমন শিক্ষক নিয়োগ দেয় তাদেরকেউ নিঃসন্দেহে অযোগ্যই বলা চলে।যোগ্যতা থেকেও যদি কেউ বা কারা অযোগ্যতার ভার বহন করে তবে তাদেরকে আমরা যোগ্য বলি কী করে?শিক্ষানীতিতে যদি বলা থাকতো শিক্ষক নিয়োগের জন্য ছয়টি ধাপ অতিক্রম করতে হবে এবং সেগুলো হবে খুবই কঠিন ধাপ তবে আমরা যোগ্য শিক্ষকদের খুঁজে পেতাম।
যেমন ধাপগুলো এই রকম হতে পারে……
এক.
মেধাবীদের(ন্যূনতম স্নাতকোত্তর ডিগ্রী,যেহেতর শিক্ষকতা পেশা তাই প্রোফেশনাল ডিগ্রী বাধ্যতামুলক)আগ্রাধিকার শর্তে প্রথমেই সাইকোলজিক্যাল পরীক্ষা হবে ।নম্বর হবে ১০০।
দুই.
বিসিএসের মত এমসিকিউ পরীক্ষা হবে।নম্বর ১০০।
তিন.
বিষয়ভিত্তিক লিখিত পরীক্ষা হবে।নম্বর ১০০ বা ২০০।
চার.
বিসিএসের আদলে ভাইভা হবে।
(এক্ষেত্রে তাঁর অতিরিক্ত যোগ্যতাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া )। নম্বর ৫০ বা ১০০।
পাঁচ.
সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ছয়.
পুলিশ ভেরিফিকেশন ও পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড।

( বিশেষ : যদি কোনো শিক্ষকের গবেষনা থাকে ও পিএইচডি ডিগ্রী থাকে তবে তাঁকে অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকের আসন বিবেচনায় আনা হতে পারে ।এক্ষেত্রে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধরণটাও পাল্টাতে পারে।)

এরপর চুড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হবে।সুপারিশ করবে পৃথক শিক্ষা সার্ভিস কমিশন।যোগ্যতা অনুযায়ী থাকবে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল।এক্ষেত্রে একজন শিক্ষক যেকোন স্তরেই শিক্ষকতা পেশা বেছে নিতে পারতেন।মর্যাদার হানি ঘটত না।বাস্তবে আমরা তা করে দেখাতে পারিনি।

বদলীপ্রথা :
যুগ যুগ ধরেই শুনে আসছি বেসরকারি শিক্ষকদের আছে নানান সমস্যা।এটাও তো অস্বীকার করতে পারি না যে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের রয়েছে নানান সমস্যা।বদলিপ্রথা অন্যতম।ধরে নিলাম একজন শিক্ষক বা একাধিক শিক্ষক কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে ম্যাচ করছে না।হতে পারে শিক্ষার্থীদের সাথে বা অভিভাবকদের সাথে তিনি খাপখাওয়াতে পারছেন না।আবার সহকর্মী বা পরিচালনা পর্ষদের সাথে সব সময় সুসম্পর্ক বিরাজ নাও করতে পারে না।কারণ মানুষেরও কখনও কখনও মন্দা যায়।ঠিক যেমন ঝতু বদলায় তেমনি মানুষ ক্ষণে ক্ষণে বদলায়।মানুষ মারা গেলে পঁচে যায়,বেঁচে থাকলে বদলায়,কারণে অকারণে বদলায়।শুধু বদলায় না আমাদের বেসরকারি শিক্ষকদের পোস্টিং।সুতরাং শুধু শিক্ষকদের ভুল বা অযোগ্যতা প্রমাণের আগে বদলীপ্রথা চালু করে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়াই কি সমীচীন নয়?!কোনো শিক্ষক যদি মনে করেন তার সমস্যা হচ্ছে সেক্ষেত্রে তিনি তো বদলি চাইতেই পারেন।জোরপূর্বক কোনো শিক্ষককে যদি সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং মামলা করে হাইকোর্টের নিম্ন আদালতে কোনো শিক্ষক নিজের পক্ষে রায় পেয়েও যদি নিজের চেয়ারে বসতে না পারেন তবে এই অযোগ্যতা দায়ভার কে নিবে? এখানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ই বেঁধে যায়।যদি বদলি প্রথা চালু থাকত তবে কোনো শিক্ষক পরিচালনা পর্ষদের চাপ থেকে মুক্তি পেতে আবেদন করে নিজেই অন্য জায়গায় চলে যেতে পারতেন অথবা মন্ত্রনালয় সেই শিক্ষককে সমস্যা মনে করলে অন্যত্র বদলি করতে পারত।অদ্বৈত কুমার সনদ বিক্রি করতে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে অন্যত্র বদলি হতে পারে কিন্তু আমাদের বেসরকারি শিক্ষকরা নিজেদের সততা দেখিয়েও অনাবেতর জীবন যাপন করে যান কিন্তু বদলি পান না।ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল অ্যাণ্ড কলেজের অধ্যক্ষসহ তিন জন শিক্ষিকাও কি এক্ষেত্রে অদ্বৈত কুমারের মত বদলি হতে পারতেন না? অরিত্রীর মত হাজারো শিক্ষার্থী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমরা তার ক্ষবর রাখি না কিন্তু আজ ভিকারুন্নেসার মত প্রতিষ্ঠান বলে এতসব মিডিয়ায় আসে আর আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের চাপ থেকে রক্ষা পেতে তড়িৎঘড়িৎ তাঁদের বরখাস্ত করে দিলো।এটা কি এক ধরণের শিক্ষা বৈষম্যে পড়ে না?এই বরখাস্তের মাধ্যমে কি দেশের হাজারো অধ্যক্ষের সিদ্ধান্ত বদলাবে?দীর্ঘদিন ধরে যদি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের জোড়ালো অভিযোগ থাকে তবে অনেক আগেই তার সমাধান হতে পারত।তাঁকে বদলি করলেই সমাধান হয়ে যেত।কিন্তু আমরা বাস্তবে তা আমলে নিইনি।এখন তা মিডিয়ায় আসায় সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়েছে যা আগে হলেও ভালো হত।সুতরাং অধ্যক্ষ ও স্কুল প্রশাসন দায়ী হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বলতা স্বীকার করতেই হয়।

বইয়ের চাপ-
সুস্থ্যভাবে বেড়ে উঠতে হলে যেকোনো শিশুর জন্যই সুস্থ্য মনের অধিকারী হতে হয়।তাকে কোনো রকম মানসিক চাপ ছাড়াই বেড়ে উঠতে হয়।আঠারো বছরের নিচে সকল ছাত্রছাত্রীই শিশুর সংজ্ঞায় আবদ্ধ।এই বয়সের কোটি কোটি শিশুর মানসিকভাবে বেড়ে উঠার বিষয়টি যতটা ভেবে দেখার প্রয়োজন বাস্তবে আমরা তা কতটা ভেবে দেখি তাও ভাবনার বিষয়।পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাস পড়ে দেখলে শিক্ষক হিসেবেবে আপনার মনে হবে ঐ শ্রেণির সিলেবাসের ওপর গবেষণা দরকার।কিভাবে এই ছোট্ট ছেলেমেয়েদের ওপর অমানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে তা ভাবতে গেলে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে।নিচের ক্লাসগুলো আর ভয়ানক।কারণ বয়সে তারা আরও ছোট।আমি সেদিকে নাই গেলাম।পঞ্চম শ্রেণিতে সৃজনশীল প্রশ্ন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিলো বা আছে সেটা না হয় শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের ওপরই ছেড়ে দিলাম।আমি শুধু বলব এটা যৌক্তিক হয়নি।কারণ শিক্ষকরাই যেখানে সুন্দরভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরী করতে পারেন না সেখানে পিইসির মত ছাত্রছাত্রীদের মাথায় সেই বোঝা চাপানো কতটা যৌক্তিক সেটা আমাদের শিক্ষক সমাজ আমার চেয়েও ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবেন।এই শিক্ষার্থীদের রয়েছে গাইড ক্রয়ের প্রবণতা।কারণ শিক্ষকরাও গাইড ছাড়া সবাই গঠনমূলক প্রশ্ন করতে পারেন না বা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশ্ন করার যথেষ্ট সময় দেন না।ফলে বাজারের গাইড কেনার ধুম পড়ে।পাবলিসার্সদের স্কুল ভিজিটিং বিষয়ে আজ না হয় বিস্তারিত নাইবা বললাম।তারাও ধীরে ধীরে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মতইই হয়ে যাচ্ছে।আর সেই সুযোগ করে দিচ্ছে আমাদেরই এক শ্রেণির শিক্ষক।তাহলে দেখা যাচ্ছে একদিকে একগাদা মূল বই আর অন্য দিকে মোটা মোটা গাইড বই।এরপরে আছে স্কুল কোচিং ও প্রাইভেট।এই চারের মাঝেই পিষ্ট হচ্ছে এই কমলমতী শিক্ষার্থীরা আর হয়ে পড়ছে শক্তমতী শিক্ষার্থী।আমি তাই কী করে বলি তারা শিশু?তারা তো শক্তমতী!!কিন্তু এই শক্তমতীরাই কিন্তু আবার পরীক্ষায় গাদা বইয়ের ভাষা আর ভারী ভারী শিক্ষকদের লম্বা লম্বা লেকচার উগরাইতে না পেরে ফেইল করে তখন কিন্তু তারা ফ্যাল ফ্যালাইয়া কাঁদতে কাঁদতে হয়ে যায় কাঁন্দমতী! বাস্তবে কি ওদের ফেইল করার কথা ছিলো? এরজন্য দায়ী কে বা কারা? তারপরে রয়েছে জিপিএ এ+ না পাওয়ার কাঁন্দতীরা।যারা ফেইল করলো তাদের যদি বাবা মা রাগের মাথায় খারাপ ভাষায় কিছু করে আর সেই কাঁন্দমতীদের কেউ কাঁদতে কাঁদতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় তবে এর দায় কে বা কারা নিবে?
শিক্ষাপদ্ধতি কি সেই দায় এড়াতে পারে?আমি হলফ করে বলতে পারি পারে না।আমাদের জেএসসি সিলেবাসের নম্বর বিভাজন ও সিলেবাসের সাথে পঞ্চম শ্রেণির বই ও সিলেবাসের তুলনা করলে এই বৈষম্যের শিক্ষাব্যবস্থা যৌক্তিক কোনো উত্তর দিতে পারবে না বলে আমি মনে করি।

লেখক:
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ টিচার্স কাউন্সিল(বিটিসি)।

Facebook Comments


শিরোনাম
আজ (১২ ডিসেম্বর) ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ দিবস পোরশায় বিএনপির কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত নিয়ামতপুরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন বিষয়ে সেমিনার নিয়ামতপুরে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ নওগাঁ-১, মাঠ কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন ৫ প্রার্থী বেনাপোলসহ সারা বাংলাদেশ কাস্টমস ৪ ঘন্টা কর্মবিরতি রাঙ্গুনিয়াতে ড. হাছান মাহমুদ এমপির সমর্থনে নির্বাচনী প্রচারণায় পোমরা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ  প্রাথমিকে চালু হচ্ছে কাগজবিহীন বিদ্যালয় পরিদর্শন ব্যবস্থা ই-মনিটরিং প্রকাশ্যে রিক্সাচালককে পেটানো কে সেই নারী? বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে হামলা নোয়াখালীতে সংঘর্ষে যুবলীগ নেতা নিহত আজ (১২ ডিসেম্বর) থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রতিটি ভোটারের কাছে উন্নয়নের বার্তা পৌছে দিতে হবে : হানিফ দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে আওয়ামীলীগ সরকারই করেছে : আনোয়ার মংলায় কর্মীসমাবেশেই শুরু ধানের শীষ নির্বাচনীর প্রচারণা উন্নয়ন ধারাবহিকতার স্বার্থে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান  হাসাদুল ইসলাম হীরা অনন্য দৃষ্টান্ত রাখলেন হাজেরা খাতুন স্কুলে পুরাতন বই বাণিজ্য! শৈলকুপায় বিএনপি প্রার্থীর গাড়ি বহরে হামলা।। মাইক্রোবাস-মোটর সাইকেল ভাঙচুর সিরিজ সমতা…ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ : বাংলাদেশ ১.. নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে সাইফুজ্জামান শিখর ও কুতুবুল্লাহ কুটি একই মঞ্চে দেশের সব স্কুলে ‘ডিজিটাল পাঠ সহায়িকা’ অ্যাপ্স প্রেরণের নির্দেশ বই উৎসব ১ জানুয়ারিই,২৪ ডিসেম্বর উদ্বোধন পিইসি ও জেএসসির ফলাফল ২৪ ডিসেম্বর রামগঞ্জ আসন‌টি শেখ হা‌সিনাকে উপহার দিতে চাই: আনোয়ার খান
© All rights reserved © 2017 Onnodristy.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com