নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৯:০৭ পূর্বাহ্ন

এমপিওর নীতিমালা চূড়ান্ত

অন্যদৃষ্টি ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২১, ৭:৩৮ অপরাহ্ন

বেসরকারি স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্তির নতুন নীতিমালা জারি করতে চলেছে সরকার। আগের নীতিমালা সহজ করেই এটি করা হয়েছে।

এতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির শর্তাবলিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাসের হারের শর্তে এবার কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। তুলে দেওয়া হয়েছে স্বীকৃতির শর্তটিও। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোতে সংশোধনী এনে নতুন এ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত সংশোধনীসহ এ-সংক্রান্ত নথি অনুমোদনের জন্য শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি অনুমোদন করলেই সংশোধিত নীতিমালা জারি করবে এ মন্ত্রণালয়। এবারের নীতিমালায় বেশ কিছু নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব থাকায় এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়া হতে পারে।

‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ)-এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১’ শীর্ষক এ নীতিমালায় বেশ কিছু নতুনত্ব রয়েছে। নতুন এ নীতিমালায় বেসরকারি শিক্ষকদের অধ্যক্ষ পদে নিযুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে এমপিওভুক্তির সম্ভাবনা কম হলেও ফেব্রুয়ারিতেই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ শুরু করা হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আশা করছি শিগগিরই সংশোধিত নীতিমালা জারি করা হবে। পরিমার্জিত নীতিমালা জারির পর নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া হবে। চলতি অর্থবছরে হয়তো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু আগামী অর্থবছরে কাজটি শেষ করা যাবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগের এমপিও নীতিমালায় কিছু অসংগতি ছিল। সেগুলো নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। কর্মকর্তারা কয়েক দফা আলোচনা করে একটি খসড়া তৈরি করেছেন। সেটি চূড়ান্ত করতেও কয়েক দফা সভা হয়েছে। আশা করছি, নীতিমালা ও জনবল কাঠামোর অসংগতি দূর হবে।

নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্তি পেতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হারের শর্তে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, আগে মফস্বলে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে ১৫০ শিক্ষার্থী থাকলেই হতো। এখন সেই শিক্ষার্থী সংখ্যা হতে হবে কমপক্ষে ২৪০ জন।

বেসরকারি কলেজের কয়েকজন অধ্যক্ষ জানান, মফস্বলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এত বেশি শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে। আর যদি শিক্ষার্থীই না পাওয়া যায়, তাহলে পাসের হার কমবেশি দিয়ে কী হবে? স্বাভাবিকভাবেই এতে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি আগের চেয়ে কঠিন হবে।

নতুন নীতিমালায় নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে আগের চারটি শর্ত থেকে একাডেমিক স্বীকৃতির ব্যাপারটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় পাসের হার কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ, পৌর এলাকায় ৫৫ শতাংশ এবং মফস্বলে ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। মাধ্যমিকে সিটি করপোরেশন এলাকার স্কুলে পাসের হার ৬৫ শতাংশ, পৌর এলাকায় ৫৫ এবং মফস্বলে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আর নিম্ন মাধ্যমিকে পাসের হার সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭০ শতাংশ, পৌর এলাকায় ৬০ ও মফস্বলে ৫৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ডিগ্রি কলেজে পাসের হার ৭০ থেকে ৪৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।

সংশোধিত নীতিমালায়, শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিকে শহর এলাকায় বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগে পৃথকভাবে ৪৫ জন এবং মফস্বলে পৃথকভাবে ৪০ জন করে শিক্ষার্থী থাকতে হবে। মাধ্যমিকে শহরাঞ্চলে প্রতি শ্রেণিতে ৪০ জন করে শিক্ষার্থী থাকতে হবে ও কমপক্ষে ৩৫ জনকে পরীক্ষা দিতে হবে। মফস্বলে ৩৫ জন করে শিক্ষার্থী থাকার ও ৩০ জনকে পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আগের এমপিও নীতিমালায় (২০১৮) কোনো প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি পেতে প্রধান চারটি শর্ত পূরণ করতে হতো। এগুলো হচ্ছে- একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা, পরীক্ষার্থী ও উত্তীর্ণের সংখ্যা। যোগ্যতা পূরণ করতে সহশিক্ষা ও বালক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। মাধ্যমিকে শহরে ৩০০ ও মফস্বলে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। স্কুল অ্যান্ড কলেজে শহরে ৪৫০ ও মফস্বলে ৩২০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে। স্নাতক পাস কলেজে শহরে ২৫০ ও মফস্বলে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। আর প্রতি শ্রেণির পরীক্ষায় শহরে ৬০ জন ও মফস্বলে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে অংশ নিতে হবে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ হতে হবে। এবারের নীতিমালায় পাসের হারে ছাড় দিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ ২০১৯ সালের অক্টোবরে সারাদেশের ২ হাজার ৭৩০টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়। তখন যোগ্যতায় না টিকলেও উপজেলাভিত্তিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে ‘এমপিওভুক্তির নীতিমালা-২০১৮’ শিথিল করে সারাদেশের ২৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নীতিমালার ২২ নম্বর ধারায় এ সুযোগ রয়েছে। এ ধারা অনুসারে, নারী শিক্ষা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দুর্গম এলাকা, চর, হাওর-বাঁওড়, চা বাগান ও পার্বত্য এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় এমপিও দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গতবার সারাদেশের মোট ৮৯টি উপজেলা ও থানা থেকে একটি প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য কাম্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তাই আঞ্চলিক সামঞ্জস্য বিধানের জন্য এমপিও নীতিমালা ২০১৮-এর ২২ ধারা প্রয়োগ করে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। তখন ৮৯টি উপজেলায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০ জন এবং স্বীকৃতির মেয়াদ দুই বছর বিবেচনায় নিয়ে সংশ্নিষ্ট উপজেলার সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ৫৮টিপ্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়। বাকি ৩১টি উপজেলা থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদনই করেনি বলে বিবেচনা করা যায়নি। আর কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ১৭৭টি উপজেলা থেকে একটিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য কাম্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) ১৯৬৭টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। এর মধ্যে ৪৩৯টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। মাধ্যমিক স্তরের (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) ১০৮টি ও মাধ্যমিক (নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি) ৮৮৭টি স্কুল এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। এ স্তরে ১৭৩৯টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় (একাদশ থেকে দ্বাদশ) পর্যায়ের ৩৩৬টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। এর মধ্যে ৬৮টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়।

অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষকদের ভাগ্যে এবারও শিকে ছেঁড়েনি: দেশের বেসরকারি কলেজগুলোর অনার্স ও মাস্টার্স পাঠদানকারী শিক্ষকদেরএমপিওভুক্ত করা হয় না। তারা আশা করেছিলেন, এবারের সংশোধিত নীতিমালায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে চূড়ান্ত করা নীতিমালায় এবারও তাদের ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি বলে জানা গেছে।

অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফোরামের নেতা হারুন অর রশিদ বলেন, সারাদেশে ৩৫০টি এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে ‘নন-এমপিও’ চার হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দীর্ঘ ২৮ বছরেও এমপিওভুক্তির নীতিমালা জনবল কাঠামোতে অনার্স-মাস্টার্স স্তরের শিক্ষকদের পদ অন্তর্ভুক্ত না করায় তারা এমপিও সুবিধা পাচ্ছেন না।

এতে পরিবার-পরিজনসহ তারা চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেশিরভাগ শিক্ষক-কর্মচারীই বেতন পাচ্ছেন না। এতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। শিক্ষক হওয়ার কারণে তারা মানুষের কাছে হাত পাততেও পারছেন না। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী এসব শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বেতন-ভাতার দায়িত্ব নেয় না। জাতীয়বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে এই করোনাকালে তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে উপাচার্যকে বারবার অনুরোধ করা হলেও তিনি তাতে রাজি হননি।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেসরকারি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষকরা অনার্স ও মাস্টার্স স্তরে সরকারি এমপিওভুক্তি পান। অথচ সাধারণ ধারার শিক্ষায় কলেজশিক্ষকরা তা পান না। এটি কি চরম বৈষম্য ও বঞ্চনা নয়? এমপিও নীতিমালায় এমন নানা অসঙ্গতি রয়েই যাচ্ছে।

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ