নোটিশ :
সংবাদকর্মী নিচ্ছে অন্যদৃষ্টি। আগ্রহীগন সিভি পাঠান- 0nnodrisrtynews@gmail.com
৩০ জুলাই ২০২০, ০৭:১৪ অপরাহ্ন

রাজনীতির নায়ক-ভিলেন ও শেষ দৃশ্য

অন্যদৃষ্টি ডেস্ক
শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮, ১১:৪০ অপরাহ্ন

মোহাম্মদ আলী, লক্ষ্মীপুর।। 

চলচ্চিত্রের রুপালী পর্দা মানবজীবনের  ঘটনাবহুল হাসি-কান্না,সুখদুঃখ, নায়ক-ভিলেন,কৌতুক, কূটকৌশল,মাফিয়া ডন,হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল,মারদাঙ্গা,জয়-পরাজয়ের মধ্যদিয়ে শেষ দৃশ্যপটের সমাপ্তি ঘটে। পেক্ষাগৃহে সিনেমার সূচনা-ইন্টারবেল আর সমাপ্তির মধ্যদিয়ে একটি সমাজ, ব্যাক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের  কল্পচিত্রের পরিসমাপ্তি সংঘটিত হয়ে থাকে। সিনেমার সার্বিক দৃশ্যায়নের সাথে জীবন দর্শন জড়িত থাকে। সিনেমার শুরুতে সমাজ-সংসারের অত্যাচারী  ভিলেন দোদন্ড প্রতাপশালী হয়ে উঠে। অর্থনৈতিক সাফল্য, আলীসান বাড়ী, ভোগবিলাস,রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন জনগনের দরদী সেজে জনগনকে নিয়ন্ত্রন করতে থাকেন। প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা, নিজের পথকে কন্টক মুক্ত করা, নিজস্ব বাহিনী তৈরী করা,  জনসম্মুখে এক রুপ রাতের আঁধারে অন্য অন্যরুপ ধারন করে স্বৈরাচারী সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করে।

সমাজের নিপীড়িত মানুষে গগনবিদারী আর্তনাদধ্বনীতে যখন সমাজ প্রকম্পিত তখনই ধী-শক্তি  সম্পুর্ন সাহসী একজন মহৎপ্রান নায়কের প্রস্থান ঘটে। ভিলেনের পথরোধ  করা নাককে প্রচন্ড শক্তিতে ভিলেন আঘাত হানতে শুরু করেন। জনসমর্থন নায়ককে আরো শক্তিশালী করে তোলেন। জয়ের ধারাবাহিকতা দিয়ে চলচ্চিত্রের নায়ক ধীরে ধীরে কালজয়ী মহানায়ক হিসাবে খ্যাতির শীর্ষে আহরন করে। প্রথমে ভিলেনের সাঙ্গপাঙ্গের পরাজয় হয় তারপর ভিলেনের নিজস্ব ছেলেপিলের পরাজয়ে ভিলেনকে দুর্বল করে ফেলে। সর্বশেষ প্রধান ঘৃনিত ভিলেনের পরাজয়ের মাধ্যমেই নায়কের জয়ের কাল্পনিক ভাবাদর্শে সম্বৃদ্ধ  গল্প জীবন ধর্মী রুপয়নের রুপদান করা হয়ে থাকে।

চলচ্চত্রের ভিলেন কোন দিন জয় লাভ করতে পারে না। ভিলেনের জয় হলে নায়কের পরাজয় ঘটে। নায়কের জয় হলে ভিলেনের পরাজয় ঘটে, সুতরাং চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের কিছু সময় পূর্ব থেকেই  নায়ক আর ভিলেনের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ, বিবাদ-বিসংবাদের মাধ্যমে গল্পের পরিসমাপ্তি হয়ে থাকে। ভিলেন আর নায়কের যুদ্ধজয়ের পরিসমাপ্তি রক্তক্ষয়ী হতে পারে কিংবা নায়ক-নায়িকার পিতা-মাতার সাথে বিরোধ নিস্পত্তি করে নৈতিক ভাবে জয়পরাজয় হতে পারে। চলচ্চিত্রের নায়ক-ভিলেনের জয়পরাজয় পরিচালকের উপর নির্ভরশীল। পরিচালক প্রযোজক বিভিন্ন কলাকৌশলীর সংগঠিত প্রয়াসে একটি নাতিদীর্ঘ চলচ্চিত্র সুটিং সম্পুর্ন হয়ে থাকে। বাস্তবায়িত চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে গল্পের জয়পরাজয় পূর্বেই নির্ধারিত থাকে। দর্শকমন্ডলী শুধুমাত্র প্রদর্শনের সময়ে নায়ক-ভিলের জয়পরাজয় অবলোকন করেতে পারেন।

চলচ্চিত্রের নায়ক-ভিলেনের চরিত্রের মত রাজনৈতিক নায়ক ভিলেন সহজে নির্ধারন করা যায় না। রাজনীতির ময়দানে একটি রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ব্যাক্তি নায়ক মাহানায়ক হওয়ার আপ্রান চেষ্টা করেও অনেক সময় নিজের অজান্তেই ভিলেনের সীমানায় অতিক্রম করে নিজকে ভিলেন হিসাবেই ইতিহাসে স্থান করে নেয়। রাজনীতিবিদগন  রাজনৈতিক নেতা কর্মীর সমন্বয়ে গঠিত একটি সিঁড়ির মত ক্রমবিন্যস্ত থাকে। রাষ্ট্রের সুপ্রিম অথরিটি দল ও জনমনের প্রতিক্রিয়া কি তাহা সঠিক ভাবে অনুধাবন করার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। একটি ভুল থেকে ক্রমান্বয়ে আরো ভুল সিদ্ধান্ত তৈরী হয়ে নিজের অজান্তেই সুপ্রিম পাওয়ারকে বেষ্টনিতে আবদ্ধ করে রাখে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময়ে  আবেগ, অনুরাগ, উত্তেজনা, ব্যাক্তি স্বার্থ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নিতি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে নিজকে জড়িয়ে ফেলে।

রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন একটি সংঘবদ্ধ শক্তির সমষ্টি। এই শক্তির সাথে সম্পর্কিত নিম্মস্তর থেকে উচ্ছ স্তর পর্যন্ত সকলই সুপ্রিম শক্তিকে সফলতার পথে এগিয়ে নিতে পারে কিংবা নিজেরা ভিলেনের বৈশিষ্ট ধারন করে দুর্বৃত্যায়নে নিজকে বিজড়িত করে সকল অর্জনকে বিসর্জন দিতে পারে। রাজনীতির ভিলেনরা সঙ্গোপনে গনবিরোধী কর্মকান্ডের  সাথে জড়িত হয়ে অপরাধ সংগঠিত করে নিজকে আড়াল করার চেষ্টা করে থাকেন। অপরাধ ও অপরাধীকে দায়মুক্তি দেওয়ার পথ খোজার চেষ্টা করেন। নিজেকে চিরস্থায়ী ক্ষমতাবান মনে করেন। ক্ষমতার ভিতরে থেকেও নিজের অজান্তে স্বক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ক্রমানয়ে নায়ক পরাজিত হয়ে কখনো ভিলেনকে জয় লাভে সাহার্য্য করেন কিংবা ভিলেনের সীমানা অতিক্রম করে ভিলেন চরিত্র থেকে নায়ক রুপ ধারন করেন।

জয়-পরাজয়ের মাধ্যমেই বেশীর ভাগ সত্যমিথ্যা নির্ধারন হয়ে থাকে। রাজনীতিতে আদর্শ বিনষ্ট না হলে অনেক সময় পরাজীত সত্য পুনরায় ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদী পথপরিক্রমায় বিজয় লাভ করে। মিথ্যার দাপটে সত্যের পথযাত্রী আক্রান্ত হতে পারে কিন্তুু শেষ বিবেচনায় সত্য ঠিকে থাকে। রাজনৈতিক দর্শন আর রাজনীতির প্রায়োগিক নেতা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। রাজনৈতিক নেতা নিজের  উপলব্ধিকে জনগনের মাঝে সম্পৃক্ত করতে পারালেই তিনি সফল পলেটিশিয়ান।জনগনকে সঙ্গে রেখেই রাজনীতি করতে হবে।জনবিচ্ছিন্ন হওয়া বড় মাফের রাজনীতিবিদ সফল নেতা হতে পারে না। ক্ষমতাকালীন সময়ে নেতা ধীরে ধীরে জনগনের চাইতে নিজকে চালাক ও বুদ্ধিমান পলিটিশিয়ান ভাবতে শুরু করে। নেতার ভুল ভাবনাকে শুধরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে চারপাশে প্রশংসাকারী শ্রেনী দ্বারা আকৃষ্ট থাকে। স্তুতিবাক্য শুনতে অভ্যস্ত নেতা জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।মানুষ মাত্রই প্রশংসাকে জীবনের মত ভালোবাসে। নেতাকে প্রশংসাবাদী হওয়ার সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও সে প্রশংসাকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

যে সকল মানুষ ইতিহাসের বরপুত্র তাদেরকেও স্ততিবাদীরা কুকোপাত করতে সক্ষম হয়েছেন। চাটুকার বেষ্টিত তোষণনীতির ফলে ক্ষমতার অভ্যান্তরে প্রাসাদ ষঢ়যন্ত্র শুরু হতে থাকে। ক্ষমতার পালাবদলের শেষ দৃশ্যের সময় সকল প্রাসাদ ষঢ়যন্ত্র সফলতা লাভ করে। প্রতিপক্ষকে সমূলে নিশ্চিহৃ করে কিংবা ক্ষমতার লোভে পিতা পুত্রের মধ্যে হত্যা কান্ড সংঘটিত করে, সহ সহপরিবারে হত্যা করেও রাজনীতির নায়ক চরিত্র অর্জন করা সম্ভব হয়নি। দেশ দখলের যুদ্ধের সাথে দেশ রক্ষার যুদ্ধে লক্ষকোটি জীবননাশ সংঘঠিত হয়ে জীবন সায়াহৃে ইতিহাসের নির্ধারিত স্থানে নায়ক ভিলেন হিসাবেই স্থান করে নিয়েছেন। মীরজাফর আলী খান সিরাজউদ্দৌলাকে ইতিহাসের নির্ধারিত স্থান থেকে সরাতে পারে নাই। রাজনৈতিক খেলার মাঠে ভালো প্লেয়াররাও অনেক সময় খেলায় হেরে যেতে পারে।

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই নৈতিক শক্তির সাথে অনৈতিক শক্তির লড়াই  চলমান। প্রত্যেক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের আদর্শিক অনুগত লোক থাকে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসিন করে থাকেন। জনকল্যানের কথা বলেই নিজ মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। অনেক সময়  মানুষ নিজেই জানে না কখন সে জনগনের শত্রুর কাতারে শামিল হয়েছেন। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনে নিরাপদ কর্ম হলো নিজে  সৎ থাকা  এবং জনস্বার্থ চিন্তা করা। জনগনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা। জনগন ও নেতার মধ্যখানে সুবিধাভোগী প্রাচীর তৈরী হওয়ার সুযোগ না দেওয়া। ক্ষমতার শক্তির সাথে ক্ষমতাবিহীন শক্তির কোন প্রার্থক্য তৈরী না করা।

সময় ও স্থায়ীত্বের বিবেচনায় কোন সরকারই শেষ সরকার নয়। এমনকি শক্তিধর কোন ব্যাক্তি কিংবা সুসজ্জিত কোন বাহিনীও শক্তিধর নয়,কোন দখলদার পরাশক্তিও নয়। রাজনীতি ও সমাজ বিবর্তন একটি অভ্যাহত ঢেউয়ের মত সন্মুখে অগ্রসরমান প্রবাহ, এই গতিধারা কখনো ধীর কখনো খরস্রোতা। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদলের কঠিন তপ্ত রুঢ় বাস্তবতায় সম্বৃদ্ধ সময়ই নায়ক ভিলেন নির্নয়ের শেষ দৃশ্য। সর্বশেষ জয় পরাজয়ের মাঝে ভিলেন থেকে গনদুশমনে পরিনত হয় এবং নায়ক থেকে মহানায়কের প্রস্থান ঘটে। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে সত্য আর মিথ্যার প্রচন্ড লড়াই চলে। পরিশেষে সত্যই জয় লাভ করে।

 

এড. মিজানুর রহমান

জজ কোর্ট, লক্ষীপুর

Facebook Comments
Print Friendly, PDF & Email
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো সংবাদ